দেশে ফিরার সপ্তম দিন আজ। এই সাত দিনে ঘর ছাড়া কোথাও বাহির হইনি । বাহির হইনি বললে ভুল হবে, দেশে ফেরার দ্বিত্বীয়দিন মায়ের নামে স্থাপিত এতিমখানায় গিয়েছিলাম। এতিমখানার দায়িত্বে যিনি.. করিম চাচা, তাকে সঙে নিয়ে একটা সিমের দোখানে গিয়েছিলাম, সিমের দোকান ছাড়া আর কোথাও যাওয়া হয়নি। নতুন সিম মোবাইলে সেট করার পর.. রাতে আমার ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে একটা মেসেজ আসলো মেসেজটা ছিলো.....
-কেমন আছো...?
নাম্বারটা দেখে মনে হলনা এর আগে কোনো দিন দেখছি বা এই নাম্বার আমার পরিচিত কারো। আমার এই নতুন নাম্বার মা,বাবা. আর করিম চাচা ছাড়া কেউ জানেনা, আর তাদের নাম্বার গুলাও আমার ফোনে সেইভ করা। তবে কে এই মেসেজ দিলো ? তা জানার কোনো প্রকার আগ্রহ নেই... কারণ হয়তো ভুল করে কেউ মেসেজটা পাঠিয়েছে।
.
দুপুর ১টায় ঘুম থেকে উঠে দেখি সেই একই নাম্বার থেকে আরো একটা টেক্স পাঠানো হইছে, সেটা ছিলো এমন
...
-এখনো ঘুমিয়ে আছো নিশ্চই ?
আমি তখন ঘুম ঘুম চোখেই টেক্সটা পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম, আমি যে এখনো ঘুমিয়ে আছি জানলো কি করে ? কে সে ? ছেলে না মেয়ে ? ছেলে বন্ধু কারো সাথেই দেখা করিনি আর তাঁরা জানেও না যে আমি দেশে আসছি, আর মেয়ে বন্ধু বলতে কেউ নাই বললেই চলে। তাহলে এই নাম্বার থেকে কে মেসেজ দেয় ? একবার কল করলেই বুঝতে পারবো, নাম্বারটা ডায়েল করে যেই কানে লাগালাম, অমনিতেই ওপর পাশ থেকে ভেসে আসলো.... (আপনার কাঙ্কিত নাম্বারটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা একটু পর আবার ডায়াল করুন )......
.
ধ্যাত ফোনটা অফ ! ঠিক একই ভাবে আরো কয়েকবার কল দেওয়ার পর সেই একই কথা ভেসে আসছিল । সন্ধ্যায় ফোন সাইলেন্ট মুডে ছিলো, ৭.৩০ মিনিটে দেখতে পেলাম সেই একই নাম্বার থেকে সন্ধ্যা ৭.২৫ মিনিটে একটা মেসেজ আমায় পাঠানো হইছে...
-ঘরে বসে আছো নিশ্চই ?
আমি তখনও কল দিলাম.. কিন্তু সেই একই কথা. (ফোনো সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা ) আমার তখন তীব্র আগ্রহ জাগলো কে সে এমন মেসেজ পাটাচ্ছে ? হয়তো পরিচিত কেউ ? কিন্তু পরিচিত কারো সাথেইতো দেখা হয় নি !! তখন আগ্রহগুলা ক্রমশই রাগে পরিণত হতে লাগলো। গতকাল রাতে যেই সময়ে আমায় টেক্স পাঠানো হয়েছিলো সেই সময় দেখে নিলাম আর সেই সময় পর্যন্ত ফোন হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম, আজ রাতে যখনই মেসেজ আসবে ঠিক তখনই আমি সেই নাম্বারে কল দিবো তাহলে হয়তো আর ফোন অফ করতে পারবেনা, বুঝতে পারবো কে সে !
.
রাত ১২.৫০ ঠিক সময় মতো আসল
মেসেজ
-কি আমার কথা ভাবছো ! কে হতে পাড়ি আমি... তাইতো ?
আমি সাথে সাথে কল দিলাম কিন্তু কল রিসিভড হলনা। দ্বিত্বীয়বার কল দিতেই সেই একই উত্তর (যংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা), সাথে সাথে আমি মেসেজের রিপ্লে দিলাম।
-কে আপনি ? আমায় চেনেন ?
কিন্তু সেই মেসেজের কোনো রিপ্লে পেলাম না।তবে মেসেজের ভাষা বলে দিচ্ছিলো সে কোনো মেয়ে,কারণ মেয়ে ছাড়া এমন টেক্স কেউ করবে না। অনেকটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলাম। কারো সাথে শেয়ারও করতে পারছিনা
.
আজ একটু দেরি হল ঘুম থেকে উঠতে তাও ইনবক্স চেক করে সেই একই ধরনের মেসেজ পেলাম। দুপুর ১টা সন্ধ্যা ৭.২৫ রাত ১২.৫০ এভাবেই চলছিলো কয়েকদিন, এই টাইমগুলাতে ইনবক্স চেক করা আমার অভ্যাস কি বদ অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল, প্রথম প্রথম অনেক রাগ হতো, কিন্তু ধীরে ধীরে কিছুদিন পর সেই রাগের দাস হয়ে গেল আমার অভ্যাসগুলা,মনে সব সময় একটাই প্রশ্ন ঘোরপাক খাইতো কে সে ? আর আমায় এমন মেসেজ করে চিন্তায় ফেলে তার'ই বা কি লাভ ? একদিন আমিও তাকে একটা টেক্স করলাম
...
.
-আচ্ছা আপনাকে কল দিলে রিসিভড করেন না কেন ? আর আমার টেক্সের রিপ্লে দেন না কেন ? কে আপনি আর কেন'ই বা আমায় এমন টেক্স করছেন ?
আমার মেসেজটা সে পড়ছিল হয়তো, আমি সাড়া দিন ফোন হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম, সে নাম্বার থেকে কখন রিপ্লে আসবে ! কিন্তু না সেদিন আর কোনো রিপ্লে আসেনি। সন্ধ্যায় ভাবলাম হয়তো কোনো মেসেজ আসবে. ইনবক্স চেক করেও কোনো মেসেজ পেলাম না, রাতেও তার কোনো মেসেজ পাইনি , কল দিয়েছিলাম, কিন্তু সেই একই কথা .... সেদিন রাতে চোখের কোণে এক ফুঁটাও ঘুম আসেনি , একটানা দুপুর ১ টা পর্যন্ত কিছুক্ষণ পর পর ইনবক্স চেক করে রাত কাটিয়ে দিলাম !
.
ঘুম হয়নি তাও প্রতিদিনের নিয়মভেদে মায়ের ডাকে বিছানা ছেড়ে উঠলাম, মা বলছিলেন এতিমখানায় একটু যেতে, সেখানে না'কি কয়েকজন ডাক্তার ক্যাম্পেইন ( বাচ্চাদের ফ্রী চিকিৎসা করতে আসছে), প্রথমে আমি যেতে চাইনি বাহিরে গেলে হয়তো মনটা একটু ভালো হবে সেই ভেবে পরে রাজি হয়ে যাই, তাও আমার কেমন জানি অস্বস্থিবোধ হচ্ছিল, তবে আমার কেনো এমন লাগছে বুঝে উঠতে পাড়ছিলাম না, কিন্তু যার কথা ভাবছি সে তো শ্রেপ অদৃশ্য! কেন আমি ভুলে যাচ্ছি বার বার! আমি নতুন কোনো মায়ায় জড়াতে চাইনা কারণ. মায়া উপেক্ষা করা যায়না, আর মায়া ত্যাগ করার মতো বিড়ম্বনা আর কিছু হতে পারেনা, এর আগেও আমি কারো মায়ার জালে বন্ধী হয়েছিলাম। বিনিময়ে এক বুক কষ্ট, আর বেদনার প্রহর গুণতে হয়েছে ,ভালোলাগার মানুষটাকে কেমন করে হারিয়েছিলাম সেই দৃশ্যটা স্মৃতির আয়নায় আবছায়ার মতো চোখে বেসে আসছিল তখন ,জীবনটা কি অদ্ভুত , মানুষ মায়ার কাঙাল.. কারণেঅকারণেই অদৃশ্য মায়ায় জড়িয়ে পরে, একসময় আমিও কারো মায়ায় জড়িয়েছিলান...
সাত বছর আগের কথা...
.
দূর সম্পর্কের এক আত্বীয়ের বিয়ে থেকে '' লোপা" নামের একটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয়, আর সেই থেকেই তার সাথে বন্ধুত্ব, কথা বলা, দেখা করা,একসময় দুটি মন এক'ই সুঁচ সুতার মত প্রেমের বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পরে ।প্রতিদিন আমাদের মধ্যে ফোনে কথা হতো.. ফোনের ব্যালেন্স শেষ হলেও অবশিষ্ট ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স ছিলো মন শান্তনার শেষ পন্থা, রাতে ফোনে কথা না হলে আমার যেনো ঘুম'ই আসতোনা, সেটা স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল, আর কথা শুরো হলে ফোনও ছাড়তে ইচ্ছে হতো না, আমি ভাবতাম ফোনে কথা বলার ইচ্ছা আমার'ই ছিলো বেশি, কিন্তু সেদিনের পর থেকে লোপার ইচ্ছেটাও বুঝতে পারলাম!
.
লোপার ইচ্ছের ছিলো ডাক্তারি পড়ার, ইন্টার শেষে মেডিকেলে চান্স পাওয়ার,তার পড়া লেখার মানউন্নয়নের জন্য তার পরিবার তাকে ফোন ব্যবহার করতে দিতোনা । প্রথম প্রথম ওর মায়ের ফোন থেকেই কথা বলতো, তার স্বপ্ন পুরুণের জন্য তার প্রতি ভালোবাসা,ও রাত জেগে কথা বলার প্রবল ইচ্ছেগুলা আমার নিজের মনেই চেপে রাখি, একদিন একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসলে আমি রিসিভড করে তো হতবাক প্রায়.....
.
-হ্যালো
-হ্যালো রায়হান ?
-হ্যাঁ
আরে এইটা তো লোপার গলা
-এই নাম্বারটা কার লোপা ?
-একটা নতুন ফোন কিনছি আর এই নতুন ফোনের নতুন নাম্বার দিয়ে প্রথম তোমায় কল দিলাম ।
-ফোন কিনছো মানে কি ? তোমার পরিবার থেকে না মানা করছে, তাহলে তোমায় ফোন দিলো কে ?
-আরে ধ্যাত কে দিবে আমি নিজে কিনছি।
-মানে কি? তুমি এতো গুলা টাকা কোথায় পাইছো ?
-আরে এইসব ছাড়ো তো ! এইটা আমার নাম্বার, দিনের বেলায় কলেজ ব্যাগে থাকবে আর রাতে আমার পাশেই থাকবে আর মায়ের ফোন দিয়ে লুকিয়ে কথা বলতে হবেনা।
হা হা হা
-আচ্ছা সব বুঝলাম, তবে আগে বলো তুমি টাকা পেলে কোথায় ?
-এই কথা না জানলে কি কথা বলা যাবেনা ?
-না আমি কথা বলব না।
-আচ্ছা তাহলে শুনো ....প্রতিদিন টিফিনে খাওয়ার জন্য মা যেই টাকা দিতো একটু একটু করে সেগুলা জমিয়েই এই ফোন কিনছি।
.
লোপার মুখ থেকে কয়েক সেকেন্ড বলা এই কথা গুলা শুনে আমার মুখের সব ভাষা যেনো নিমিষেই হারিয়ে গেলো, এমন কথার প্রতি কথা কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলামনা তখন,তাও তার বলা শেষে এই একটা কথাই বলছিলাম
-নিজে না খেয়ে ,নিজেকে কষ্ট দিয়ে ফোন কিনার কি প্রয়োজন ছিলো ?
-হ্যাঁ দরকার ছিলো,, না খেয়ে যতটুকু কষ্ট হতো, তোমার সাথে কথা না বলা একটা রাত তার চেয়ে শত গুন কষ্টের ছিলো ,আর এই যে তোমার সাথে আজ কথা বলছি এতেই আমার সব কষ্টের অবসান ঘটছে, তোমার সাথে কথা বলাই আমার সকল প্রাপ্তি, সত্যি আজ আমি অনেক খুশি ।
.
লোপার কথা শুনে মনে হলো মেয়েটার বয়স কম হলেও ভালোবাসাটা শিখেছে খুব! আসলে এমন মেয়ে যদি সব ছেলের ভাগ্যে জোটতো তাহলে হয়তো সব ছেলেরাই ভালোবাসার আসল মানে বুঝতো। লোপার সাথে দেখা করতে যেতাম তার কলেজ ক্যাম্পসের প্রথম ফটক পেরিয়ে একটা শিমুল গাছের নিচে। শিমুল ফুল ফুঁটলে সেই গাছের নিচে দাঁড়ালে তার নাক বেয়ে সর্দি ঝড়তো, ওর সেই বাচ্ছা সূলভ অভ্যাসটা ছিলো রূপকথা গল্পের কোনো এক কিশোরীর চরিত্রের মতো। সদ্য ফুঁটা শিমুল ফুলের গন্ধে তার এই অবস্থা দেখে আমি শুধো হাসতাম 'ই ।
.
তার কিছুদিন পর....
লোপা অনেক দিন ধরে বলছিলো তার বিয়ে নিয়ে পরিবারে কথা হচ্ছে, আমাদের সম্পর্কের কথা গুলা না কি তার মা, বাবা জেনে গিয়েছে, এক সময় লোপার বিয়ে ঠিক করা হয়, যার সাথে লোপার বিয়ে ঠিক করা হয়েছে সে কোনো এক শিল্পপতির আদুরে দুলাল, লোপার স্বপ্ন পূরণের জন্য সব করবে ছেলেটা লোপার পরিবারের কাছে এমন কথাই দিয়েছিলো সে জানতে পারলাম,আর কিছু হোক বা না হোক তার স্বপ্ন পূরণ হবে এটাই বড় কথা , আর আমি তখন মাত্র অর্থনীতিতে ৩য় বর্ষে পড়তাম, বাবা একটা সরকারী প্রতিষ্টানের ৩য় শ্রেণীর কর্মকর্তা ছিলেন সেই উপার্জনেই টানাটানি করে সংসার চলতো, তাও আমি আমার এক বন্ধুকে দিয়ে লোপার মা বাবার কাছে লোপাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাটাই, কিন্তু সে দিন তাকে অপমান হয়ে ফিরতে হয়েছিলো । হাল ছাড়িনি নিজেই গিয়েছিলাম শেষে, কিন্তু বিনিময়ে সেই ছোটলোক, লোভী অপবাধ ঘাঁড়ে বয়ে নিয়ে ফিরছিলাম, লোপাও সেদিন ফোনে বলছিলো
-তোমায় ছেড়ে এই জীবনে আর কাউকে জড়াবোনা, আমায় নিয়ে চলো রায়হান!
সেদিন আমি তাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম, আর শেষ এই কথা গুলাই বলছিলাম
-ভালো থেকো, সুখী হইও, তোমার স্বপ্ন পূরণ হোক!
.
সেই দিনের পর থেকে আমার নাম্বার অফ ছিলো, তার বিয়ের আগের দিনই আমি প্রবাসে চলে যাই, এর পর থেকে আর কোনো যোগাযোগ হয় নি লোপার সাথে, অনেক কষ্টে এই সাতটি বছর কাটিয়েছি,প্রথম প্রথম কাজে মন বসতোনা,তাও সব সময় নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখতে চাইতাম যাতে সেই না পাওয়ার বেদনা গুলা আমায় স্পর্শ না করতে পারে, কিন্তু রাত হলেই পেছনে ফেলে আসা সেই দিনের কথা স্পষ্ট ভাবে চোখে ভেসে উঠতো, আর তার ফলে চোখের কোণ ঘেঁষে কিছু ব্যর্থতার অস্রু ঝড়ে পড়তো,এভাবেই চলতো রাতের পর রাত দিনের পর দিন, কখনো কেউকে বলিনি নিজের কষ্টের কথা গুলা, শুধো মনের মধ্যে চেপে রেখেছিলাম, আজ সাত বছর পর সফল হয়ে দেশে ফিরছি, শুধো ব্যাতিক্রম হল প্রথম জীবনে ভালোবাসার মানুষটা আজ আর আমার জীবনে নাই, হয়তো এই সফলতা আর কারো জন্যই নয়, তবে মায়ের একটা ইচ্ছে পূরণ করতে পারছি আমি, মায়ের নামে এতিমখানা স্থাপনাই ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতার প্রতিচ্ছবি। আজ কিছু প্রশ্ন মনে উঁকি দিচ্ছে..
.
এতো দিনে লোপা নিশ্চই খুব সংসারি হয়ে গেছে ? হয়তো তার সাহেবের মেয়ের বা ছেলের চোখের জল কিংবা তার মতো নাক বেয়ে পরা সর্দি গুলা তার শাড়ির পার দিয়ে মুছে দিচ্ছে ! আজ হয়তো সে ভুলে গেছে আমার কথা! মনে রাখবে-ই -বা কেন ? আমিতো সেদিন পালিয়েছিলাম, হয়তো সেও বুঝতে পাড়ছিল তার সুখের কথা ভেবেই আমি এমন ভাবে সরে দাঁড়িয়েছিলাম, বহুপরে দেশে ফেরার কোনো ইচ্ছে ছিলোনা আমার, তাও বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে মা, বাবার জন্যই ফিরতে হল আবার,,, ভাবতে ভাবতে মায়ের ডাক পড়লো।
.
-কি রে চল
-হ্যাঁ চলো
মা.বাবা.ও আমি. তিনজন'ই বেড়িয়ে পড়লাম, এতিমখানায় একজন মহিলা ডাক্তারকে দেখে বেশ চেনা মনে হচ্ছিলো, তার পাশে যেতেই আমি চমকে উঠলাম, এতো লোপা !...
...আমায় দেখে সে কোনো রকম সংকোচবোধ না করেই জিজ্ঞেস করে বসলো...
-কি ব্যাপার রায়হান সাহেব কেমন আছেন ?
লোপার এমন প্রশ্নের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না,,তখন ভাবছিলাম, এতো বছর পর আমায় দেখে হয়তো একটু একাকিত্তে নিয়ে কথা বলতে চাইবে, একটু আবেগাপ্লুত হবে, কিন্তু না লোপার মাঝে তার রেশটুকুও ছিলো না। তাও আমি বলে উঠলাম
.....
-হ্যাঁ ভালোই
-তুমি ?
-দেখতে-ই পারছো আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, তাও বলছি বেশ ভালোই আছি।
.
লোপার কথা শুনে কৌতুহলবসত জিজ্ঞেস করে বসলাম...
-তা তোমার-সাহেব ? আর তোমার বাচ্ছাখাচ্ছা কেমন আছে ?
-না কপালে ঔসব জোটেনি আদৌ
-তার মানে ?
.
-বিয়ের আগের দিন রাতেই ঘর ছেড়ে পালিয়েছিলাম, এক বান্ধবীর বাসায় থেকে সাত বছর একটা স্কুলে শিক্ষকতা করে পড়া-লেখা চালিয়েছি,আর সে বান্ধবীর মা বাবার সহযোগিতা আর সহায়তায় আমি মেডিকেলে চান্স পাই,আর সেই থেকেই আমি স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে এই পর্যন্ত আসতে পারছি, সেদিনের পর থেকে পরিবারের কারো সাথেই আর যোগাযোগ করিনি।
শুধো তোমার অপেক্ষায় ছিলাম
.
লোপার এমন ভূমিকা ছাড়া কথা গুলা শুনেও যেনো আমার মনে আবারো আশার বাণী শুনতে চাইলো,হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে কাছে পেয়ে আবারও নতুন করে বাঁচার ইচ্ছে ইচ্ছিলো, ইচ্ছে হচ্ছিলো বলতে, আমার স্বপ্ন গুলাকে আবারও তার হাতে তুলে দিতে চাই, চোখ বুঝে যাকে বিশ্বাস করছিলাম, বহু পরে মনে হচ্ছে আজ আমি সত্যি সফলদের একজন, সত্যি তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখীও ভাগ্যবান ব্যক্তি মনে হচ্ছিলো, এমন করে কয়জন মেয়ে ভালোবাসতে পারে ? আমিতো ব্যর্থ হয়ে পালিয়েছিলাম, কিন্তু আজ লোপাকে ফিরে পেয়ে মনে হচ্ছিলো...আবারো তার হাত ধরে সুখের পথে যুগ যুগ হাঁটি, তখনো সেখানে ক্যাম্প চলছিলো তাই সেখানে অযাচিত কিছু করলাম না , আমি তার ফোন নাম্বার চাইলাম, লোপা টেবিলে রাখা ব্যাগ থেকে ওর ফোন বাহির করছিলো, তখন আমার ফোনের মেসেজ টিউন- টা বেজে উঠলো। কি ব্যপার সে নাম্বার থেকে এখনো আবার মেসেজ আসলো! কি লিখা আছে? মেসেজটা পড়তে লাগলাম....
-কি মিস্টার রায়হান নাম্বারটা কার ? কে সে ? তার উত্তরঃ-সামনে যে ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে'ই এই মেসেজওয়ালি, হা হা হা
.
-তার মানে সেই সন্ধ্যা, রাত, দুপুরে খবর নেওয়া মেসেজওয়ালি'ই তুমি ?
হ্যাঁ,তুমি প্রবাসে চলে যাওয়ার পর এম,বি,বি,এস শেষ করার তীব্র জেদ আমায় তাড়া করতে থাকে,আর সে দিনের পর থেকে আর যোগাযোগ করতে চাইনি, কারন আমার বিশ্বাস ছিল তুমি ফিরবে, তাই শুধো অপেক্ষায় ছিলাম তোমার , আর যেদিন তুমি দেশে ফিরে সিম কিনতে সিমের দোকানে গিয়েছিলে সেদিন আমিও গিয়েছিলাম সেই দোকানে, তোমায় দেখে একটু আড়ালে চলে গিয়েছিলাম, আর সেই দোখানের ফ্ল্যক্সিলোডের খাতা থেকেই তোমার নাম্বারটা সংগ্রহ করছি । আবারো এক হলো দুটি মন, দুজন-দুজনার ভালোবাসার কথাগুলা কম বলা হলেও, অব্যক্ত বেদনা গুলাই বলে দিচ্ছিলো তারা একে অপরকে কতটা ভালোবাসে, অত:পর রায়হানের মা বাবা তাদের সম্পর্কের কথা জেনে, তাদের বিয়ের আয়োজন করে...যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় তাদের বিয়ে
...বাসর রাতে....
রায়হান যখন বাসর ঘরে ঢুকছিলো, লোপা তখন খাঠ থেকে নেমে রায়হানের পা ছুঁয়ে কদমবুসি করতে লাগলো, তখন রায়হান -লোপাকে দাঁড় করিয়ে বুকে টেনে নিয়ে বললো
-তোমার স্থান তো এই বুকে!
-আমিও চাই সাড়া জীবন তোমার বুকে মাথা গুঁজে থাকতে, তুমি ছাড়া যে আপন বলতে আর কেউ নেই রায়হান,খুব ভালোবাসি তোমায়, তাই আজ আমি সর্বহারা
-হুম,হয়তো তোমার অপেক্ষাই আমায় আবারো ফিরিয়ে দিয়েছে, খুব ভালোবাসি তোমায়..
হঠাৎ করেই রুমের টিউব লাইট অফ হয়ে গেল হয়তো লোডশেডিং..... তাই আর কিছু বুঝতে পারলাম না, তবে বাসরঘরের কাহিনী সবার'ই জানা আছে তাই এবার একটু চেপে গেলাম... হা হা হা
.
বাসররাত থেকে আবারো শুরো হয় তাদের প্রেমের নতুন এক অধ্যায়, হাজার বছর বেঁচে থাকুক তারা, লোপা রায়হানের নিস্পাপ নিষ্কলুষ প্রেম পৃথিবীর বুকে চলতে থাকুক অবিরাম, সেই প্রত্যাশায় ইতিটানা হলো এই গল্পের।
-কেমন আছো...?
নাম্বারটা দেখে মনে হলনা এর আগে কোনো দিন দেখছি বা এই নাম্বার আমার পরিচিত কারো। আমার এই নতুন নাম্বার মা,বাবা. আর করিম চাচা ছাড়া কেউ জানেনা, আর তাদের নাম্বার গুলাও আমার ফোনে সেইভ করা। তবে কে এই মেসেজ দিলো ? তা জানার কোনো প্রকার আগ্রহ নেই... কারণ হয়তো ভুল করে কেউ মেসেজটা পাঠিয়েছে।
.
দুপুর ১টায় ঘুম থেকে উঠে দেখি সেই একই নাম্বার থেকে আরো একটা টেক্স পাঠানো হইছে, সেটা ছিলো এমন
...
-এখনো ঘুমিয়ে আছো নিশ্চই ?
আমি তখন ঘুম ঘুম চোখেই টেক্সটা পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম, আমি যে এখনো ঘুমিয়ে আছি জানলো কি করে ? কে সে ? ছেলে না মেয়ে ? ছেলে বন্ধু কারো সাথেই দেখা করিনি আর তাঁরা জানেও না যে আমি দেশে আসছি, আর মেয়ে বন্ধু বলতে কেউ নাই বললেই চলে। তাহলে এই নাম্বার থেকে কে মেসেজ দেয় ? একবার কল করলেই বুঝতে পারবো, নাম্বারটা ডায়েল করে যেই কানে লাগালাম, অমনিতেই ওপর পাশ থেকে ভেসে আসলো.... (আপনার কাঙ্কিত নাম্বারটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা একটু পর আবার ডায়াল করুন )......
.
ধ্যাত ফোনটা অফ ! ঠিক একই ভাবে আরো কয়েকবার কল দেওয়ার পর সেই একই কথা ভেসে আসছিল । সন্ধ্যায় ফোন সাইলেন্ট মুডে ছিলো, ৭.৩০ মিনিটে দেখতে পেলাম সেই একই নাম্বার থেকে সন্ধ্যা ৭.২৫ মিনিটে একটা মেসেজ আমায় পাঠানো হইছে...
-ঘরে বসে আছো নিশ্চই ?
আমি তখনও কল দিলাম.. কিন্তু সেই একই কথা. (ফোনো সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা ) আমার তখন তীব্র আগ্রহ জাগলো কে সে এমন মেসেজ পাটাচ্ছে ? হয়তো পরিচিত কেউ ? কিন্তু পরিচিত কারো সাথেইতো দেখা হয় নি !! তখন আগ্রহগুলা ক্রমশই রাগে পরিণত হতে লাগলো। গতকাল রাতে যেই সময়ে আমায় টেক্স পাঠানো হয়েছিলো সেই সময় দেখে নিলাম আর সেই সময় পর্যন্ত ফোন হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম, আজ রাতে যখনই মেসেজ আসবে ঠিক তখনই আমি সেই নাম্বারে কল দিবো তাহলে হয়তো আর ফোন অফ করতে পারবেনা, বুঝতে পারবো কে সে !
.
রাত ১২.৫০ ঠিক সময় মতো আসল
মেসেজ
-কি আমার কথা ভাবছো ! কে হতে পাড়ি আমি... তাইতো ?
আমি সাথে সাথে কল দিলাম কিন্তু কল রিসিভড হলনা। দ্বিত্বীয়বার কল দিতেই সেই একই উত্তর (যংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা), সাথে সাথে আমি মেসেজের রিপ্লে দিলাম।
-কে আপনি ? আমায় চেনেন ?
কিন্তু সেই মেসেজের কোনো রিপ্লে পেলাম না।তবে মেসেজের ভাষা বলে দিচ্ছিলো সে কোনো মেয়ে,কারণ মেয়ে ছাড়া এমন টেক্স কেউ করবে না। অনেকটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলাম। কারো সাথে শেয়ারও করতে পারছিনা
.
আজ একটু দেরি হল ঘুম থেকে উঠতে তাও ইনবক্স চেক করে সেই একই ধরনের মেসেজ পেলাম। দুপুর ১টা সন্ধ্যা ৭.২৫ রাত ১২.৫০ এভাবেই চলছিলো কয়েকদিন, এই টাইমগুলাতে ইনবক্স চেক করা আমার অভ্যাস কি বদ অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল, প্রথম প্রথম অনেক রাগ হতো, কিন্তু ধীরে ধীরে কিছুদিন পর সেই রাগের দাস হয়ে গেল আমার অভ্যাসগুলা,মনে সব সময় একটাই প্রশ্ন ঘোরপাক খাইতো কে সে ? আর আমায় এমন মেসেজ করে চিন্তায় ফেলে তার'ই বা কি লাভ ? একদিন আমিও তাকে একটা টেক্স করলাম
...
.
-আচ্ছা আপনাকে কল দিলে রিসিভড করেন না কেন ? আর আমার টেক্সের রিপ্লে দেন না কেন ? কে আপনি আর কেন'ই বা আমায় এমন টেক্স করছেন ?
আমার মেসেজটা সে পড়ছিল হয়তো, আমি সাড়া দিন ফোন হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম, সে নাম্বার থেকে কখন রিপ্লে আসবে ! কিন্তু না সেদিন আর কোনো রিপ্লে আসেনি। সন্ধ্যায় ভাবলাম হয়তো কোনো মেসেজ আসবে. ইনবক্স চেক করেও কোনো মেসেজ পেলাম না, রাতেও তার কোনো মেসেজ পাইনি , কল দিয়েছিলাম, কিন্তু সেই একই কথা .... সেদিন রাতে চোখের কোণে এক ফুঁটাও ঘুম আসেনি , একটানা দুপুর ১ টা পর্যন্ত কিছুক্ষণ পর পর ইনবক্স চেক করে রাত কাটিয়ে দিলাম !
.
ঘুম হয়নি তাও প্রতিদিনের নিয়মভেদে মায়ের ডাকে বিছানা ছেড়ে উঠলাম, মা বলছিলেন এতিমখানায় একটু যেতে, সেখানে না'কি কয়েকজন ডাক্তার ক্যাম্পেইন ( বাচ্চাদের ফ্রী চিকিৎসা করতে আসছে), প্রথমে আমি যেতে চাইনি বাহিরে গেলে হয়তো মনটা একটু ভালো হবে সেই ভেবে পরে রাজি হয়ে যাই, তাও আমার কেমন জানি অস্বস্থিবোধ হচ্ছিল, তবে আমার কেনো এমন লাগছে বুঝে উঠতে পাড়ছিলাম না, কিন্তু যার কথা ভাবছি সে তো শ্রেপ অদৃশ্য! কেন আমি ভুলে যাচ্ছি বার বার! আমি নতুন কোনো মায়ায় জড়াতে চাইনা কারণ. মায়া উপেক্ষা করা যায়না, আর মায়া ত্যাগ করার মতো বিড়ম্বনা আর কিছু হতে পারেনা, এর আগেও আমি কারো মায়ার জালে বন্ধী হয়েছিলাম। বিনিময়ে এক বুক কষ্ট, আর বেদনার প্রহর গুণতে হয়েছে ,ভালোলাগার মানুষটাকে কেমন করে হারিয়েছিলাম সেই দৃশ্যটা স্মৃতির আয়নায় আবছায়ার মতো চোখে বেসে আসছিল তখন ,জীবনটা কি অদ্ভুত , মানুষ মায়ার কাঙাল.. কারণেঅকারণেই অদৃশ্য মায়ায় জড়িয়ে পরে, একসময় আমিও কারো মায়ায় জড়িয়েছিলান...
সাত বছর আগের কথা...
.
দূর সম্পর্কের এক আত্বীয়ের বিয়ে থেকে '' লোপা" নামের একটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয়, আর সেই থেকেই তার সাথে বন্ধুত্ব, কথা বলা, দেখা করা,একসময় দুটি মন এক'ই সুঁচ সুতার মত প্রেমের বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পরে ।প্রতিদিন আমাদের মধ্যে ফোনে কথা হতো.. ফোনের ব্যালেন্স শেষ হলেও অবশিষ্ট ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স ছিলো মন শান্তনার শেষ পন্থা, রাতে ফোনে কথা না হলে আমার যেনো ঘুম'ই আসতোনা, সেটা স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল, আর কথা শুরো হলে ফোনও ছাড়তে ইচ্ছে হতো না, আমি ভাবতাম ফোনে কথা বলার ইচ্ছা আমার'ই ছিলো বেশি, কিন্তু সেদিনের পর থেকে লোপার ইচ্ছেটাও বুঝতে পারলাম!
.
লোপার ইচ্ছের ছিলো ডাক্তারি পড়ার, ইন্টার শেষে মেডিকেলে চান্স পাওয়ার,তার পড়া লেখার মানউন্নয়নের জন্য তার পরিবার তাকে ফোন ব্যবহার করতে দিতোনা । প্রথম প্রথম ওর মায়ের ফোন থেকেই কথা বলতো, তার স্বপ্ন পুরুণের জন্য তার প্রতি ভালোবাসা,ও রাত জেগে কথা বলার প্রবল ইচ্ছেগুলা আমার নিজের মনেই চেপে রাখি, একদিন একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসলে আমি রিসিভড করে তো হতবাক প্রায়.....
.
-হ্যালো
-হ্যালো রায়হান ?
-হ্যাঁ
আরে এইটা তো লোপার গলা
-এই নাম্বারটা কার লোপা ?
-একটা নতুন ফোন কিনছি আর এই নতুন ফোনের নতুন নাম্বার দিয়ে প্রথম তোমায় কল দিলাম ।
-ফোন কিনছো মানে কি ? তোমার পরিবার থেকে না মানা করছে, তাহলে তোমায় ফোন দিলো কে ?
-আরে ধ্যাত কে দিবে আমি নিজে কিনছি।
-মানে কি? তুমি এতো গুলা টাকা কোথায় পাইছো ?
-আরে এইসব ছাড়ো তো ! এইটা আমার নাম্বার, দিনের বেলায় কলেজ ব্যাগে থাকবে আর রাতে আমার পাশেই থাকবে আর মায়ের ফোন দিয়ে লুকিয়ে কথা বলতে হবেনা।
হা হা হা
-আচ্ছা সব বুঝলাম, তবে আগে বলো তুমি টাকা পেলে কোথায় ?
-এই কথা না জানলে কি কথা বলা যাবেনা ?
-না আমি কথা বলব না।
-আচ্ছা তাহলে শুনো ....প্রতিদিন টিফিনে খাওয়ার জন্য মা যেই টাকা দিতো একটু একটু করে সেগুলা জমিয়েই এই ফোন কিনছি।
.
লোপার মুখ থেকে কয়েক সেকেন্ড বলা এই কথা গুলা শুনে আমার মুখের সব ভাষা যেনো নিমিষেই হারিয়ে গেলো, এমন কথার প্রতি কথা কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলামনা তখন,তাও তার বলা শেষে এই একটা কথাই বলছিলাম
-নিজে না খেয়ে ,নিজেকে কষ্ট দিয়ে ফোন কিনার কি প্রয়োজন ছিলো ?
-হ্যাঁ দরকার ছিলো,, না খেয়ে যতটুকু কষ্ট হতো, তোমার সাথে কথা না বলা একটা রাত তার চেয়ে শত গুন কষ্টের ছিলো ,আর এই যে তোমার সাথে আজ কথা বলছি এতেই আমার সব কষ্টের অবসান ঘটছে, তোমার সাথে কথা বলাই আমার সকল প্রাপ্তি, সত্যি আজ আমি অনেক খুশি ।
.
লোপার কথা শুনে মনে হলো মেয়েটার বয়স কম হলেও ভালোবাসাটা শিখেছে খুব! আসলে এমন মেয়ে যদি সব ছেলের ভাগ্যে জোটতো তাহলে হয়তো সব ছেলেরাই ভালোবাসার আসল মানে বুঝতো। লোপার সাথে দেখা করতে যেতাম তার কলেজ ক্যাম্পসের প্রথম ফটক পেরিয়ে একটা শিমুল গাছের নিচে। শিমুল ফুল ফুঁটলে সেই গাছের নিচে দাঁড়ালে তার নাক বেয়ে সর্দি ঝড়তো, ওর সেই বাচ্ছা সূলভ অভ্যাসটা ছিলো রূপকথা গল্পের কোনো এক কিশোরীর চরিত্রের মতো। সদ্য ফুঁটা শিমুল ফুলের গন্ধে তার এই অবস্থা দেখে আমি শুধো হাসতাম 'ই ।
.
তার কিছুদিন পর....
লোপা অনেক দিন ধরে বলছিলো তার বিয়ে নিয়ে পরিবারে কথা হচ্ছে, আমাদের সম্পর্কের কথা গুলা না কি তার মা, বাবা জেনে গিয়েছে, এক সময় লোপার বিয়ে ঠিক করা হয়, যার সাথে লোপার বিয়ে ঠিক করা হয়েছে সে কোনো এক শিল্পপতির আদুরে দুলাল, লোপার স্বপ্ন পূরণের জন্য সব করবে ছেলেটা লোপার পরিবারের কাছে এমন কথাই দিয়েছিলো সে জানতে পারলাম,আর কিছু হোক বা না হোক তার স্বপ্ন পূরণ হবে এটাই বড় কথা , আর আমি তখন মাত্র অর্থনীতিতে ৩য় বর্ষে পড়তাম, বাবা একটা সরকারী প্রতিষ্টানের ৩য় শ্রেণীর কর্মকর্তা ছিলেন সেই উপার্জনেই টানাটানি করে সংসার চলতো, তাও আমি আমার এক বন্ধুকে দিয়ে লোপার মা বাবার কাছে লোপাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাটাই, কিন্তু সে দিন তাকে অপমান হয়ে ফিরতে হয়েছিলো । হাল ছাড়িনি নিজেই গিয়েছিলাম শেষে, কিন্তু বিনিময়ে সেই ছোটলোক, লোভী অপবাধ ঘাঁড়ে বয়ে নিয়ে ফিরছিলাম, লোপাও সেদিন ফোনে বলছিলো
-তোমায় ছেড়ে এই জীবনে আর কাউকে জড়াবোনা, আমায় নিয়ে চলো রায়হান!
সেদিন আমি তাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম, আর শেষ এই কথা গুলাই বলছিলাম
-ভালো থেকো, সুখী হইও, তোমার স্বপ্ন পূরণ হোক!
.
সেই দিনের পর থেকে আমার নাম্বার অফ ছিলো, তার বিয়ের আগের দিনই আমি প্রবাসে চলে যাই, এর পর থেকে আর কোনো যোগাযোগ হয় নি লোপার সাথে, অনেক কষ্টে এই সাতটি বছর কাটিয়েছি,প্রথম প্রথম কাজে মন বসতোনা,তাও সব সময় নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখতে চাইতাম যাতে সেই না পাওয়ার বেদনা গুলা আমায় স্পর্শ না করতে পারে, কিন্তু রাত হলেই পেছনে ফেলে আসা সেই দিনের কথা স্পষ্ট ভাবে চোখে ভেসে উঠতো, আর তার ফলে চোখের কোণ ঘেঁষে কিছু ব্যর্থতার অস্রু ঝড়ে পড়তো,এভাবেই চলতো রাতের পর রাত দিনের পর দিন, কখনো কেউকে বলিনি নিজের কষ্টের কথা গুলা, শুধো মনের মধ্যে চেপে রেখেছিলাম, আজ সাত বছর পর সফল হয়ে দেশে ফিরছি, শুধো ব্যাতিক্রম হল প্রথম জীবনে ভালোবাসার মানুষটা আজ আর আমার জীবনে নাই, হয়তো এই সফলতা আর কারো জন্যই নয়, তবে মায়ের একটা ইচ্ছে পূরণ করতে পারছি আমি, মায়ের নামে এতিমখানা স্থাপনাই ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতার প্রতিচ্ছবি। আজ কিছু প্রশ্ন মনে উঁকি দিচ্ছে..
.
এতো দিনে লোপা নিশ্চই খুব সংসারি হয়ে গেছে ? হয়তো তার সাহেবের মেয়ের বা ছেলের চোখের জল কিংবা তার মতো নাক বেয়ে পরা সর্দি গুলা তার শাড়ির পার দিয়ে মুছে দিচ্ছে ! আজ হয়তো সে ভুলে গেছে আমার কথা! মনে রাখবে-ই -বা কেন ? আমিতো সেদিন পালিয়েছিলাম, হয়তো সেও বুঝতে পাড়ছিল তার সুখের কথা ভেবেই আমি এমন ভাবে সরে দাঁড়িয়েছিলাম, বহুপরে দেশে ফেরার কোনো ইচ্ছে ছিলোনা আমার, তাও বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে মা, বাবার জন্যই ফিরতে হল আবার,,, ভাবতে ভাবতে মায়ের ডাক পড়লো।
.
-কি রে চল
-হ্যাঁ চলো
মা.বাবা.ও আমি. তিনজন'ই বেড়িয়ে পড়লাম, এতিমখানায় একজন মহিলা ডাক্তারকে দেখে বেশ চেনা মনে হচ্ছিলো, তার পাশে যেতেই আমি চমকে উঠলাম, এতো লোপা !...
...আমায় দেখে সে কোনো রকম সংকোচবোধ না করেই জিজ্ঞেস করে বসলো...
-কি ব্যাপার রায়হান সাহেব কেমন আছেন ?
লোপার এমন প্রশ্নের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না,,তখন ভাবছিলাম, এতো বছর পর আমায় দেখে হয়তো একটু একাকিত্তে নিয়ে কথা বলতে চাইবে, একটু আবেগাপ্লুত হবে, কিন্তু না লোপার মাঝে তার রেশটুকুও ছিলো না। তাও আমি বলে উঠলাম
.....
-হ্যাঁ ভালোই
-তুমি ?
-দেখতে-ই পারছো আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, তাও বলছি বেশ ভালোই আছি।
.
লোপার কথা শুনে কৌতুহলবসত জিজ্ঞেস করে বসলাম...
-তা তোমার-সাহেব ? আর তোমার বাচ্ছাখাচ্ছা কেমন আছে ?
-না কপালে ঔসব জোটেনি আদৌ
-তার মানে ?
.
-বিয়ের আগের দিন রাতেই ঘর ছেড়ে পালিয়েছিলাম, এক বান্ধবীর বাসায় থেকে সাত বছর একটা স্কুলে শিক্ষকতা করে পড়া-লেখা চালিয়েছি,আর সে বান্ধবীর মা বাবার সহযোগিতা আর সহায়তায় আমি মেডিকেলে চান্স পাই,আর সেই থেকেই আমি স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে এই পর্যন্ত আসতে পারছি, সেদিনের পর থেকে পরিবারের কারো সাথেই আর যোগাযোগ করিনি।
শুধো তোমার অপেক্ষায় ছিলাম
.
লোপার এমন ভূমিকা ছাড়া কথা গুলা শুনেও যেনো আমার মনে আবারো আশার বাণী শুনতে চাইলো,হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে কাছে পেয়ে আবারও নতুন করে বাঁচার ইচ্ছে ইচ্ছিলো, ইচ্ছে হচ্ছিলো বলতে, আমার স্বপ্ন গুলাকে আবারও তার হাতে তুলে দিতে চাই, চোখ বুঝে যাকে বিশ্বাস করছিলাম, বহু পরে মনে হচ্ছে আজ আমি সত্যি সফলদের একজন, সত্যি তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখীও ভাগ্যবান ব্যক্তি মনে হচ্ছিলো, এমন করে কয়জন মেয়ে ভালোবাসতে পারে ? আমিতো ব্যর্থ হয়ে পালিয়েছিলাম, কিন্তু আজ লোপাকে ফিরে পেয়ে মনে হচ্ছিলো...আবারো তার হাত ধরে সুখের পথে যুগ যুগ হাঁটি, তখনো সেখানে ক্যাম্প চলছিলো তাই সেখানে অযাচিত কিছু করলাম না , আমি তার ফোন নাম্বার চাইলাম, লোপা টেবিলে রাখা ব্যাগ থেকে ওর ফোন বাহির করছিলো, তখন আমার ফোনের মেসেজ টিউন- টা বেজে উঠলো। কি ব্যপার সে নাম্বার থেকে এখনো আবার মেসেজ আসলো! কি লিখা আছে? মেসেজটা পড়তে লাগলাম....
-কি মিস্টার রায়হান নাম্বারটা কার ? কে সে ? তার উত্তরঃ-সামনে যে ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে'ই এই মেসেজওয়ালি, হা হা হা
.
-তার মানে সেই সন্ধ্যা, রাত, দুপুরে খবর নেওয়া মেসেজওয়ালি'ই তুমি ?
হ্যাঁ,তুমি প্রবাসে চলে যাওয়ার পর এম,বি,বি,এস শেষ করার তীব্র জেদ আমায় তাড়া করতে থাকে,আর সে দিনের পর থেকে আর যোগাযোগ করতে চাইনি, কারন আমার বিশ্বাস ছিল তুমি ফিরবে, তাই শুধো অপেক্ষায় ছিলাম তোমার , আর যেদিন তুমি দেশে ফিরে সিম কিনতে সিমের দোকানে গিয়েছিলে সেদিন আমিও গিয়েছিলাম সেই দোকানে, তোমায় দেখে একটু আড়ালে চলে গিয়েছিলাম, আর সেই দোখানের ফ্ল্যক্সিলোডের খাতা থেকেই তোমার নাম্বারটা সংগ্রহ করছি । আবারো এক হলো দুটি মন, দুজন-দুজনার ভালোবাসার কথাগুলা কম বলা হলেও, অব্যক্ত বেদনা গুলাই বলে দিচ্ছিলো তারা একে অপরকে কতটা ভালোবাসে, অত:পর রায়হানের মা বাবা তাদের সম্পর্কের কথা জেনে, তাদের বিয়ের আয়োজন করে...যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় তাদের বিয়ে
...বাসর রাতে....
রায়হান যখন বাসর ঘরে ঢুকছিলো, লোপা তখন খাঠ থেকে নেমে রায়হানের পা ছুঁয়ে কদমবুসি করতে লাগলো, তখন রায়হান -লোপাকে দাঁড় করিয়ে বুকে টেনে নিয়ে বললো
-তোমার স্থান তো এই বুকে!
-আমিও চাই সাড়া জীবন তোমার বুকে মাথা গুঁজে থাকতে, তুমি ছাড়া যে আপন বলতে আর কেউ নেই রায়হান,খুব ভালোবাসি তোমায়, তাই আজ আমি সর্বহারা
-হুম,হয়তো তোমার অপেক্ষাই আমায় আবারো ফিরিয়ে দিয়েছে, খুব ভালোবাসি তোমায়..
হঠাৎ করেই রুমের টিউব লাইট অফ হয়ে গেল হয়তো লোডশেডিং..... তাই আর কিছু বুঝতে পারলাম না, তবে বাসরঘরের কাহিনী সবার'ই জানা আছে তাই এবার একটু চেপে গেলাম... হা হা হা
.
বাসররাত থেকে আবারো শুরো হয় তাদের প্রেমের নতুন এক অধ্যায়, হাজার বছর বেঁচে থাকুক তারা, লোপা রায়হানের নিস্পাপ নিষ্কলুষ প্রেম পৃথিবীর বুকে চলতে থাকুক অবিরাম, সেই প্রত্যাশায় ইতিটানা হলো এই গল্পের।
Post a Comment