ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার ৬মাস পর পাগলাগারদে পা রাখলাম ।
ছোটোবেলা থেকেই পাগল সম্পর্কে আগ্রহ ছিলো খুব ।"৩পাগলে
হলো মেলা নদে এসে. . . তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে"
গানটি শুনার পর থেকেই এই আগ্রহ ।পাগল কখনো ভয় পাই নাই ।
সবসময় চাইতাম পাগল সম্পর্কে জানতে ।স্কুল কলেজের নাটকের
পার্টটাও ব্যাচ থেকে আমি করতাম ।নিজেকে পাগল ভাবতেও
অনেক আনন্দ পেতাম ।
_
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে পরিদর্শনে আসলাম ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে রিপোর্ট জমা দিতে হবে ।খুব
সাজানো গোছানো পরিবেশ অথচ মানুষগুলো অপ্রকৃতিস্থ ।নীল
পোশাক পরা কিছু কিছু পাগলের শরীরে লোহার "ডান্ডা ভেরি"
পড়ানো ।পরিবেশটা খুব উপভোগ করতে লাগলাম ।সুন্দর কিছু সময় ।
চেষ্টা করতে থাকলাম কিছু পাগলদের সাথে ভাব জমাতে ।
_
হঠাত্ চোখ আটকে গেলো আমার ।বাউন্ডারি দেয়ালের কোনা
ঘেসা ফুল বাগানের পাশে লাল হয়ে যাওয়া উসখোখুশকো ছোট
চুল,কঙ্কালসার চেহারা,রুগ্ন শরীর,উদাসীন চোখ,নীল পোশাক ।মুখ
টা চেনা চেনা,কিন্তু মনে করতে পারছি না কোথায় দেখেছি এই
মুখ ।
_
চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে খুব,অষ্পষ্ট দেখছি,কেন যেনো
মনে হচ্ছে আইনস্টানের "থিওরি অব রিলেটিভিটি" আমার উপর
কাজ করছে ।সময় থেমে গেছে ।পিছিয়ে যাচ্ছি আমি ৬বছর
পিছনে ।দেখতে পাচ্ছি রাতুল আর নিতুর মিষ্টি কেমেষ্ট্রি ।
_
সায়েন্সের তুখোর ছাত্র ছিলো রাতুল ।আমি আর্টসে পড়লেও
বন্ধুত্ব ছিলো ভাইয়ের মতো ।স্কুল লেভেলেই এই ছেলেটার সাথে
সখ্যতা ।রাজনীতি করতাম,সিগারেট টানতাম,রাতের বেলা আড্ডা
দিতাম,তবুও ওর মতো একজন বন্ধু পাওয়া ছিলো ভাগ্যের ব্যাপার ।
মিডায়াম টাইপে ভালো রেজাল্ট করতাম,চেষ্টা করলে ভালো
হতাম এইটাই হয়তো ওর মনে কাজ করতো,তাই মিশতো ।নিতু গার্লস
স্কুলে পড়তো ।খুব সুন্দর কন্ঠে গান গাইতো সে ।কোকিলের সাথে
এমপি মহোদয় একবার তুলনা করেছিলেন ।তবুও খুব কম বলা হবে ।
_
ভদ্র রাতুলই একদিন নিতুর গান শুনে প্রেমে পড়ে যায় ।এলাকার
কলেজেই ভর্তি হয়েছিলাম সবাই ।একদিন রাতুলকে দেখলাম নদীর
পাড়ে বসে আছে ।আধাত্মিক মন আমার সময় পেলেই ছুটে যেতো
নদীর পাড়ে ।নদীর স্রোতের সাথে ভাসিয়ে দিতাম সব কষ্ট
নিজের ।সেদিন ও মন খুলে বলেছিলো নিতুর কথা ।ওকে বাসায়
পাঠিয়ে দিয়ে নদীর পাড়ে বসে ছিলাম অনেকক্ষন ।
_
পরদিন কলেজ গেলাম ।নিজের গাছের সবচেয়ে বড় গোলাপ ফুলটা
নিলাম ।রাতুলের হাতে দিয়ে বললাম সেদিনই প্রপোজ করতে ।ও
অনেকটা ভ্যাবাচ্যাকা খায় ।ওকে বুঝিয়ে রাজি করলাম ।আমার
সাথে পার্টির পোলাপান কিছু নিতুকে থামালাম,গোল দিয়ে
দাড়িয়েছিলাম ।ছোট-বড় কেউ কিছু বলতে পারে নাই,কারন বয়স
কম থাকলেও অনেক জনপ্রিয়তা আর ক্ষমতাও ছিলো আমার ।রাতুল
ধীর পায়ে এগিয়ে যায়,হাঁটু মুড়ে জানায় মনের সকল সূক্ষ্ম অনূভুতি
গুলো ।সাহিত্যের ভাষায় আমার দেখা প্রথম প্রোপোজ ছিলো
এটা ।
_
নিতু ফুলটা নেয় ।ও বলেছিলো ভেবে জবাব দিবে ।পরদিনই শুনলাম
ও প্রপোজ এক্সেপ্ট করেছে ।রাতুলকে খুশি দেখেছিলাম সেদিন ।
মানুষ যে সুখেও কাঁদতে পারে এইটা জেনেছিলাম সেদিনই ।এর
পরেরটা খুব সোজা ।হাঁসি,কান্না,ঝগড়া,খুনসুটি দেখতাম ওদের ।
ক্যাম্পাসের হিট ও আলোচিত ঝুটি ছিলো ।ভালো লাগতো এমন
একটি সুন্দর সম্পর্কের সাথে নিজের কিছু অংশ আছে এটা ভেবে ।
_
কলেজ জীবন শেষে ঢাকা চলে গেলাম ।ভর্তি হয়েছিলাম ভালো
একটি ভার্সিটিতে ।আমার রাজনীতি করা হয়নি আর ।হয়ে গেলাম
সুশীল আর ভদ্র ।একদিন আমায় ফোন দিলো আমার আম্মু,জানলাম
রাতুল বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে ।পরে এলাকার বন্ধুদের কাছে
জানলাম নিতুর বিয়ে ঠিক হয়েছিলো ।ভদ্র আর ব্রিলিয়ান্ট রাতুল
সেদিন বিয়ের পিড়ি থেকে নিয়ে গিয়েছিলো নিতুকে ।পথের
মাঝে নিতুর বড়ভাই ওদের ধরে নিয়ে যায় ।আর মারে রাতুলকে ।
নিতুর খোঁজ কেউ জানেনি ।৭দিন পর রাতুল আত্মহত্মা করে ।এরপর
অনেকদিন লেগেছিলো নিজেকে সামলাতে ।
_
এলাকায় আর যাইনি ।রাতুলের কবরের সামনে দাঁড়াতে হবে এই ভয়
নিজের এলাকা থেকে রেখেছে বহুদূর ।ভাবতাম নিতু হয়তো সুখেই
আছে শুধু ঝরে গেছে আমার বন্ধুর জীবন ।মেয়েদের খারাপ ভাবতে
শুরু করলাম ।একটা জীবন নষ্ট করে সে হয়তো বিয়ে করে নতুন জীবন
শুরু করছে ।
_
চোখের ঘোলাটে ভাব কাটতে লাগলো ।পাশে দাঁড়ানো ডাক্তার
বলতে লাগলো,"মেয়েটি নিজেকে শেষ করতে চেয়েছিলো গলায়
দড়ি দিয়ে ।কিন্তু পরিবার দেখতে পেয়ে তাকে বাঁচায় ।নিজে
কে একাকী বন্দি করে রাখতে রাখতে একসময় মানসিক ভারসাম্য
হারিয়ে এই পাগলিটা এখানে জায়গা করে নেয়" ।
_
বৃষ্টি শুরু হলো ।নিতু নামের পাগলিটা ভিজছে ।ভিজছি আমিও ।
ভাবছি সব মেয়ে এক নয় ।কিছু কিছু মেয়ে সত্যিই ভালোবাসে ।
_
হুম রাতুলের ভালোবাসার পাগলিটা আজ সত্যিই পাগলি ।

Post a Comment

Previous Post Next Post