আমি আর দূর্জয় ব্যাগ নিয়ে এয়ারর্পোট দাড়িয়ে আছি। অবশ্য কোথায়ও যাওয়ার জন্য নয় বরং নেপাল ঘুরে আসলাম। কিন্তু আমাদের রিসিভ করতে আসার কথা ছিল আমাদের বন্ধু রাজের। কিন্তু ২ ঘন্টা পার হয়ে গেল কিন্তু ওর আসার কোন নামই নেই। ওরে ফোন দিলেও লাভ নেই কারন ওর মোবাইল বন্ধ। ওরে বলে ছিলাম আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য কিন্তু আমাদের সাথে গেলে নাকি ওর টিউশনির সমস্যা হবে। তাই আমি জোর করি নি যাওয়ার জন্য। যাই হোক, বসে থাকতে থাকতে সময় চলে যাচ্ছে দেখে দূর্জয় বলল.....
-- কিরে রিজু রাজের তো আসার কোন খবর নেই?
-- হুমম আমিও ভাবতেছি।
-- আরো ওয়েট করবি নাকি চলে যাবো।
-- দূর্জয় আরেকটু ওয়েট করি। কারন রাজ তো কখনো এতো লেট করে না। তাছাড়া ঢাকার রাস্তার জ্যাম তো ১৫ মিনিটের জায়গা ৩ ঘন্টা লাগে।
-- তা অবশ্য ঠিক।
শুধু মাত্র রাজের সব সময় লেট না করার কারনেই আমরা ওয়েট করছি।
রাজ,রিজু আর দূর্জয় খুব ভাল ফ্রেন্ড আমরা। অবশ্য আমার নাম সৌরভ কিন্তু সবাই রিজু বলেই ডাকে। আমরা যাই করি এক সাথে করি। তবে আমাদের মাঝে রাজ একটু আলাদা কারন ও খুব সময় মেনে চলে। যদি আমরা বলি যে রাত ৯ টা বাজে আড্ডা দিবো তাহলে সবার আগে রাজ হাজির। আর দূর্জয় সে তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দিন কাটায়। তবে আমাদের মাঝে সব থেকে বড় মিল হলো আমরা কেউ প্রেম করি না। আমাদের গ্রুপটার নাম হলো " ব্যাচেলার দল"।
যাই হোক,  রাজের আসার কোন সম্ভাবনা না দেখে আমরা আর ওয়েট না করে বেড়িয়ে গেলাম। একবার বাসায় যাই পরে রাজকে বুঝাবো এই রিজু কি জিনিস।
.
নরসিংদী বাস এসে থামতেই নেমে গেলাম। আর এখন রাত প্রায় ৯ টার উপর বাজে। ইশশ শীতকাল বলে চারিদিকে মানুষ নেই বললেই চলে। শহরপুরী যেন কোন কাল ঘুমে আছন্ন হয়ে আছে। এখন বাসায় যেতে বড় জোর আধা ঘন্টা লাগবে।
ব্যাগটা কাধেঁ নিয়ে একটা রিকশা খুজতেঁ লাগলাম। কিন্তু একটু সামনে যেতেই হালকা টি-শার্টে  একটা লোক কে এগিয়ে আসতে দেখি। কুয়াশা শেষ করে লোকটা সামনে আসতেই দেখি এটা রাজ। কিন্তু এই কুয়াশার মাঝে শুধু হালকা একটা টি-শার্ট পরলো আর তার মাঝেও লাল দাগ লেগে আছে। ও সামনে এসেই আমাদের সাথে গলা মিলালো। তখন আমি বললাম....
-- কিরে হারামী একটু রিসিভ করতে গেলে কি এমন সমস্যা হতো হে?
-- আরে দোস্ত যেই শীত করে বুঝোস না। আর এতো রাতে একা একা বাসা থেকে যেতেও তো ভয় করে।
-- কিসের ভয়?
-- ভূতের ভয়।
-- হা হা হা রাজ তুই বোকাই রয়ে গেলি। এত্তো বড় হয়ে গেলি আর ভূতকে ভয় পাস। এইসব কখনো হয় না।
-- ওই ভূতের নাম নিবি না। পরে রাতে আমার ঘুম হবে না কিন্তু...
রাজের মুখে এমন কথা শুনে আমি আর দূর্জয় হাসতে লাগলাম। রাজ এসে আমার আর দূর্জয়ের মাঝে দাড়িয়ে হাটঁতে লাগলো। আসলে রাজ একটু এমনই। খুব মিশুক কিন্তু খুব ভয় পায়। হঠাৎ  একটা দুষ্ট বুদ্ধি মাথায় আসলো। তাই রাজকে বললাম....
-- রাজ তুই একটু দাড়া। আমি দূর্জয়ের সাথে কিছু কথা ছিল?
-- আমাকে ছেড়ে কি কথা আবার হে?  তোদের যতই পারশনাল কথাই হোক না কেন  সেই কথা আমিও শুনবো।
-- আরে তোর জন্য একটা মেয়ে পছন্দ করছি তাই এই ব্যাপারে তুই না শুনলেও ভাল দোস্ত।
-- ও আগে তো বলবি। আমি জানি তো তোরা আমার দোস্ত।
-- হুমম
রাজের থেকে একটু দূরে এসে দূর্জয়ের সাথে আমার একটা প্লেনের কথা বললাম। প্লেনটা হলো, আমাদেরকে এয়ারর্পোট থেকে রিসিভ করতে না যাওয়ার জন্য আজ রাতে আর বাসায় যাবো না বরং নদীর পাড়ে হাটঁতে যাবো। আর ওই খানে একটা বট গাছ আছে। ওই গাছের এক পাশে শশ্মান আর অন্য পাশে কবরস্থান। তাই ওই গাছের নিচে বসে আড্ডা দেওয়ার মজাই আলাদা হবে।
আমি আমার প্লেনের কথাটা দূর্জয়কে বলায় তো দূর্জয় হাসতে হাসতে মেনে নিলো। তাই রাজের সামনে এসে বললাম...
-- দোস্ত চল আজ বাসায় যাবো না বরং সারা রাত ঘুরবো।
-- ও তবে আমার একটা শর্ত আছে।
-- কি?
-- পাচঁটা ললিপপ কিনে দে।
-- কেন?
-- কারন সারা রাত ঘুরতে ঘুরতে চকলেট খাবো। এতে ভূতের ভয় করবে না।
-- হা হা চল দিবো।
.
তিনজন বন্ধু মিলে নদীর পাড় ধরে হাটছি আর অনেক মজা করছি। অনেক রাত হওয়ার কারনে সব দোকানও বন্ধ আর মানুষও নেই বললেই চলে। আর খুব শীত করছে তাই ইচ্ছা করছে এক কাপ চা খেতে। হঠাৎ দেখি নদীর পাশেই একটা দোকান দেখা যাচ্ছে তাই তিন জনেই গেলাম। দোকান প্রায় বন্ধ করার অবস্থা তাই দৌড়ে গেলাম। আমি বললাম....
-- মামা দোকানটা পরে বন্ধ করেন?  তিনটা চা বানিয়ে দেন না।
-- না না অনেক রাত হইছে। সামনেই বট গাছ আর কবরস্থান আর শশ্মান। আমি পারবো না।
-- দেখেন আপনার মেয়ের জামাই যদি এতো রাতে চায়ের কথা বলতো তাহলে কি না করতে পারতেন?
-- ওই আমি এখনো বিয়ে করি নি।
-- কি বলেন মামা?  আপনারে তো পুরো সালমান খানের মত লাগে। কি সুন্দর বডি আর আপনার হেয়ার স্টাইল তো পুরাই শাকিব খানের মত।
-- আচ্ছা বসেন চা দিচ্ছি। কয় কাপ বানাতে হবে?
-- তিনকাপ দেন।
লোকটা আমার উত্তর শুনে কেমন করে যেন তাকালো। পরে চা বানাতে লাগল। আমি চা নিয়ে রাজ আর দূর্জয়কে দিলাম।
আমাদের চা খাওয়ার দিকেও লোকটা কেমন করে দেখছে তবে বিশেষ করে রাজের দিকে। কিন্তু রাজ চা না খাওয়াতে আমি বললাম.....
-- কিরে রাজ চা খাবি না?
-- আমার শরীরের ঠান্ডা এইটুকু গরম চায়ে কমবে না। তোরা খা?
-- ওকে
আমরা চা খাওয়া শেষ করে হাটঁতে শুরু করলাম কিন্তু পিছনে তাকিয়ে দেখি দোকানদার তারাতারি দোকান বন্ধ করতে শুরু করছে। আর বারবার আমাদের দিকে তাকাচ্ছে।মনে হচ্ছ, আমরা ওর বিয়েতে ফ্রীতে খেতে চলে যাবো।
.
অনেক হাটাঁর পর মনে হয় এমন একটা জায়গায় আসলাম কিন্তু রাজের তো ভয়ে অবস্থা খারাপ হওয়ার কথা কিন্তু ও এতো নরমাল কেন? তাছাড়া ও যেন একটু আগে আগেই হেটেঁ চলেছে। আস্তে আস্তে আমরা তিনজনেই বট গাছটার নিচে গিয়ে বসলাম । এখন তো আমার ভিতরের জল শুকিয়ে আসছে। কারন একদিকে কবরস্থান আর অন্য দিকে শশ্মান আর মাঝে আমি। এখন কয়টা বাজে এটাও বুঝতে পারছি না। কারন যখন রাজের সাথে একটা সেলফি তুলছিলাম তখন থেকেই মোবাইল নষ্ট আর হাত ঘড়ির ব্যাটারি শেষ। রাজ কে দেখে খুব নরমাল মনে হচ্ছে।
-- কিরে রাজ তোর ভয় করছে না?
না তো।
-- এমন একটা জায়গায় আসলাম আর ভয় করছে না।
-- ভয় কেন পাবো? এক পাশে তুই আছিস আর আরেক পাশে দূর্জয়। যদি ভূতে ধরে তাহলে তোদেরই আগে ধরবে। হি হি
-- তুই সত্যি হারামী।
-- হুমম রতনে রতন চিনে।
এসে ছিলাম রাজ কে ভয় দেখাবো বলে কিন্তু এখানে এসে আমি আর দূর্জয়ই পুরো ভয়ে কাপঁচ্ছি। হঠাৎ রাজ বলল..

-- রিজু তোরে আমার কিছু কথা বলার ছিল?
-- বলার আগে পারমিশন খুজতেঁ শুরু করলি কবে থেকে?
-- আসলে ঘটনাটা শুরু হয় তিন মাস আগে। কিন্তু যখন আমি ভাবলাম তোদের বলবো তখন তোরা দুইটা নেপালে যাস আর এক মাস পর ফিরলি। তোদের যাওয়ার দুই মাস আগে সব ঘটনাটা ঘটে।
-- এমন কি সিরিয়াস কাহিনী?
তখন রাজ তার ঘটে যাওয়া গত তিন মাসের কাহিনী বলতে শুরু করে...
.
সকালে ঘুমিয়ে ছিলাম হঠাৎ তূর্য ভাইয়ের ফোনে ঘুমটা ভেঙ্গে  যায়। ঘুম ঘুম চোখে ফোনটা রিসিভ করি।
-- হ্যালো ভাই বলো।
-- কিরে রাজ তোর কি কান্ড জ্ঞান নাই?  আজ যে অন্য পাড়ার সাথে ক্রিকেট ম্যাচ আছে ভুলে গেলি।
-- ও ক্রিকেট ম্যাচ তো ৯ টা থেকে আর এখন মাত্র ৬ টা বাজে।
-- কিরে রাতে কি কিছু খেয়ে ঘুমাই ছিলি নাকি?
-- মানে?
-- দেখ ঘড়ি মনে হয় উল্টা করে ধরে রাখছিস। এখন ৯ টা বাজে।
-- ও তেরি,  সত্যি তো...
-- তুই ২০ মিনিটের মাঝে আয় নয়ত সাড়ে নয়টা থেকে খেলা শুরু করে দিবো।
-- আসতাছি ভাই।
ফোনটা রেখেই ওয়াশরুমে গেলাম আর ১০ মিনিটে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে পরলাম। আমার বাসা থেকে মাঠে যেতে ১০ মিনিট লাগে। কোন রকমে তারাতারি মাঠে গিয়ে পৌছাঁলাম। আর তূর্য ভাই আমার উপর রাগারাগি করতেছে আমি দেরি করছি বলে। যাই হোক,  সব ঝামেলা বাদ দিয়ে খেলায় মন দিলাম। টসে হেরে আমাদের ফিল্ডিং নিতে হলো। আর আমি একটু লম্বা বলে লেগ বাউন্ডারিতে দাড় করিয়ে দিছে।
খেলা ভালই চলছিল হঠাৎ আমার উপর দিয়ে বল আসল আর আমি লাফ দিয়ে বলটা ধরি। কিন্তু মাটিতে আমার পা পরতেই একটা মেয়ের সাথে মারাত্মক আকারে ধাক্কা খাই আর মেয়েটা পরে যাবে তাই ওরে বাম হাত দিয়ে ধরে ফেলি আর ডান হাতে আমার বল। মেয়েটাকে দেখে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি যেন কোন ছবির ক্লাইমেক্স চলছে। যখন সবার ডাকে বাস্তবে আসলাম আর মেয়েটা ছেড়ে দিয়ে খেয়াল করি তখন আমার এক পা বাউন্ডারির ভিতরে আর আরেক পা বাউন্ডারির বাইরে। একদিকে তূর্য ভাই আমায় বকতে লাগলো আর আরেক দিকে মেয়েটাও বকতে বকতে চলে যেতে লাগলো। আমি তো ভাবলাম শুভদৃষ্টি হয়ে গেছে আর এখন প্রেম হওয়া বাকি। কিন্তু এতো ধানি লঙ্কা, পুরো ভয়ংকর। হায়রে কপাল,  ভাবলাম কোয়েল মল্লিক আর হয়ে গেল বিন্দু মাসি। তোর কপালে প্রেম নেই রাজ।
অনেক বকা খেয়ে আবার খেলায় মন দিলাম কিন্তু মন দিতে পারছি কই?  শুধু ওই মেয়েটার কথা মনে পরছে। মানুষ সত্যিই বলে,  জীবন কখনো গল্পের মত হয় না তবে জীবনে যা হতে পারে তা গল্পেও সম্ভব নয়।
অন্য দলের ব্যাটিং শেষে আমাদের টার্গেট দিল ১০ ওভারে ৯৪ রান। আর আমাকে ওপেনিং করতে বলল। কিন্তু কি ভাবছি বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে ওই মেয়ে বুঝি বকতে বকতে বল হাতে বল করতে আসছে। সবার চিৎকারে আবার বাস্তবে আসি আর পিছনে তাকিয়ে দেখি স্যাম্প মাটতে পরে আছে। যখন ব্যাট হাতে ফিরে আসলাম তখন তূর্য ভাই পারে না আমায় দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে মারে।
খেলা শেষ হতেই দেখি আমরা ৬ রানে হারছি। তখন তো তূর্য ভাই আমারে ইচ্ছা মত বলতে লাগলো.....
-- একটা মেয়ে জন্য তোর মনযোগ নষ্ট হলো আর একটা ছয় ছাড়লি। মাঝখান থেকে খেলাটা হারলাম।
-- আরে ভাই,  খেলাটা জিতলে কি মেয়েটারে এমন করে দেখতে পারতাম। আর যদি মেয়েটা মাটিতে পরে যেত তাহলে তোমার দলেরই অপমান হতো।তোমার দলের একটা ছেলের জন্য মেয়ে মাটিতে পরে গেল। এটা শুনতেই খারাপ লাগে গো তূর্য ভাই।
-- ও খারাপ লাগে। তাহলে মাঠে না থেকে যা আমাদের এলাকায় ১৭ নাম্বার বাসার সামনে গিয়ে দাড়া। ঘন্টায় ঘন্টায় শুভদৃষ্টি হবে।
-- সেখানে কি করে?
-- কারন মেয়ের বাসা এটা।
-- তুমি কেমনে জানো?
-- আমার এলাকার মেয়ে আর আমি জানবো না।
-- ও তাহলে তো ভালই হলো। তুমি তোমার ছোট ভাইয়ের বউটারে দেখে রেখো যাতে কোন শিয়াল মুরগি না নিয়ে যেতে পারে।
-- বাহ্ তুই হয়ত প্রথম মানুষ যে বড় ভাইকে বললি ছোট ভাইয়ের বউ দেখে রাখতাম।
-- হি হি হি আচ্ছা তোমার ছোট ভাইয়ের বউটার নাম কি?
-- আগে বিয়ে কর পর বউ ডাকিস। আর ওর নাম বিথী।
-- উম্মাহ্ ভাই আমার বিয়েতে দুইটা মিষ্টি বেশি খাইও।
-- হাটট
সব খবর নিয়ে চলে আসলাম এবার একটু ঘুরে দেখি প্রেম করতে পারি কি না। হঠাৎ রিজুর ফোন আসলো...
-- কিরে রাজ কই তুই?
-- বাসায় যাচ্ছি।  কেন?
-- আমি আর দূর্জয় দুই মাস পর নেপাল ঘুরতে যাবো। তুই যাবি আমাদের সাথে?
-- না রে দোস্ত আমার টিউশনি আছে। আর তোদের জন্য বৌদি বানানোর জন্য এক মেয়ে খুজছিঁ।
-- তুই জীবনেও প্রেম করতে পারবি না।
-- কেন রে?
-- হুহহ এমনি রাখি।
-- ওকে।
বাসায় চলে আসলাম আর ফ্রেশ হয়ে টিউশনিতে গেলাম। কিন্তু এবার তূর্য ভাইদের এলাকার উপর দিয়ে গেলাম। কিন্তু ওই মেয়েকে দেখি নি কিন্তু বাসাটা তো খুজেঁ পাইছি।
.
কয়েকদিন পর ভার্সিটিতে যাবো কয়জন বন্ধুর সাথে দেখা করতে। কারন আমাদের ফাইনাল ইয়ারও শেষ আর সব বন্ধু আস্তে আস্তে যে যার বাসায় চলে যাচ্ছে। তাই ভার্সিটিতে আসতেই দেখি বিথী এক বান্ধবীর সাথে দাড়িয়ে বেলপুরী খাচ্ছে। আমি সামনে যেতেই এমন ভাবে তাকালো যেন আমি ওর বেলপুরী খেয়ে নিছি।
-- ওই এমন করে তাকিয়ো না বাবু প্রেম হয়ে যাবে তো।
-- তুমি আমায় ফলো করছো কেন?
-- ইশশ তোমায় ফলো করতে তো আমার ঠেকা পড়ছে।
-- তাহলে এখানে আসছো কেন?
-- বন্ধুদের সাথে দেখা করতে। আর শুনো,  তুমি হিন্দি বুঝো তো।
-- হুমম কেন?
-- তাহলে শুনো আমাদের বার বার দেখা হবেই কারন শাহরুখ বলেছে,  ফির মিলেঙ্গে চলতে চলতে।
-- স্টুপিড।
-- এই বকাটার জন্য এই বেলপুরীটা আমার।
বলেই ওর হাত থেকে বেলপুরী নিয়ে সোজাঁ বন্ধু মহল ভবনে চলে গেলাম। আর পিছন ফিরেও দেখি নি। মনে হয় আমাকে বকতে বকতে মুখ ব্যাথা করে ফেলছে।
.
আজ প্রায় ১ সপ্তাহ হলো বিথীর সাথে দেখা করতে যেতে পারি না কারন টিউশনি করে সময় দিতে পারি না। তাই ওরে মিসও করি কারন আমি না হয় ওরে দেখলে জ্বালাই তবে সেটা তো আমার ভাল লাগা থেকেই। কারন খুব সহজে ভালবাসা হয় না। ভালবাসা হতে গেলেও একটু সময় লাগে একজন আরেক জনকে বুঝতে। তাই ভাবলাম এবার ওর সাথে দেখা করে ওরে সরি বলে ওর সাথে বন্ধুত্ব করবো।
.
টিউশনি শেষ করে ভার্সিটির সামনে দাড়িয়ে আছি বিথীর জন্য। প্রায় ৩০ মিনিট পর মেডামকে আসতে দেখে ভালই লাগছে। বাহ্ আজ এতো সাজঁলো কেন? মনে হয় বয়ফ্রেন্ডের জন্য। গুরুজন ঠিকই বলে,  খাওয়া সময় আর প্রেম করার সময় একটু নিলজ্জ হতেই হয় নয়ত খাবার আর গার্লফ্রেন্ড কোনটাই জুটবে না।
ও আমার সামনে এসেই দাড়ালো আর বলল...
-- কি মিস্টার রাজ আজ জ্বালাবে নাকি?
-- ওই তুমি আমার নাম জানলে কি করে?
-- ওই দিন তুমি যখন মাঠে আমায় ফেলে দিতে গিয়ে ধরে ফেলো তখন তূর্য ভাইকে আমি দেখি। আর ওনি আমাদের এলাকায় থাকে আর ওনার থেকে তোমার সব খবর নিলাম।
-- তো আমার সম্পর্কে কি কি জানলে?
-- এই যে তুমি দিনে কাউকে সময় দাও না শুধু টিউশন নিয়ে থাকো। পরে নিজের কষ্ট লুকিয়ে অন্যদের হাসাও। তোমার পরিবারে কে কে আছে?  তুমি কেমন ছেলে  এইসব।
-- ও জানি তো তূর্য ভাইকেও আমি এত্তো ভালবাসি।
-- ও ভাই আরো বলল তুমি বান্দর, শয়তানের হাড্ডি আর রাক্ষস টাইপের।
-- ওই হারামী তূর্য কখনো কারো ভাল দেখতে পারে না।
-- কেন?
-- ভাবলাম একটা প্রেম সরল লেখায় চলছে মাগার হারামী এটারে বক্ররেখা প্রেম বানাই দিছে। ওর কপালে মেয়ে জুটবো না। আর মেয়ে জুটলেও ওর পরিবার মানবো না।
-- হা হা হা তো আজ এখানে আসছো কেন?
-- তোমায় সরি বলতে আর বন্ধুত্ব করতে।
-- বন্ধুত্ব করতে নাকি...
-- না শুধু বন্ধুত্ব।
-- হুমম।
-- আচ্ছা বিথী বায়।
-- রাজ শুনো...
-- বলো।
-- ফির মিলেঙ্গে চলতে চলতে।
ও কথাটা বলে একটা মুচকি হাসি দিয়ে গেল আর আমার মনে পেয়ার কি ঘন্টি বাজিয়ে গেল।
.
এভাবে দিন গুলো ভালই চলতে শুরু করলো। আমাদের দেখা করাও বেড়ে গেল।ইচ্ছে করলেই দেখা করতে চলে যেতাম বিথীর বাড়ির বাইরে। তবে ওর সাথে ফুসকা খাওয়ার মাঝে মজা আছে। ওর নিজের জন্য বানানো ফুসকা গুলো আমি নিয়ে খেতাম আর ও ইচ্ছা মত আমায় বকতো। ওর চোখে কাজল দেওয়াটা যেন আস্তে আস্তে আমায় ভালবাসায় টানতে লাগলো।
এখন হয়ত বলতে পারবো যে আমি ওরে ভালবাসি। কারন আমার মনের জায়গায় নিজে এসে জায়গা দখল করে নিয়েছে। ইচ্ছে করে ওরে ভালবাসি কথাটা বলেই দেই কিন্তু ভয় হয় যদি বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। তবে ওরে যদি এখন মনের কথা না বলতে পারি তাহলে হয়ত আমায় গান গাইতে হবে " খাচাঁ ভেঙ্গে পাখি উড়ে গেল রে, শূণ্য ডালে গিয়ে বাসা বেধেছেঁ। তাই এতো কিছু জানি,  যা আছে কপালে দেখা যাবে সকালে। কাল সকালেই ওরে প্রপোজ করে দিবো।
.
ওর জন্য দাড়িয়ে আছি আর আসার আগে ফোন দিয়ে আসছি। একটু পরেই মেডামের আগমন হলো। তবে ওরে যত দেখি ততই প্রেমে পরি।
-- কি হলো এতো তাকিয়ে আছো কেন?
-- কই না তো।
-- কিছু কি বলবে যে তারাতারি আসতে বললে?
-- ভুলে গেছি।
-- ও আচ্ছা শুনো কাল আমার জন্মদিন আর রাতে এসো আমাদের বাসায়।
-- তোমার বাসায় গেলে তোমার বাবা মা কি ভাববে?
-- তাও তো কথা?  আচ্ছা কি পরিচয় দেওয়া যায় বলো তো।
-- আমি জানি না।
-- ওকে বলবো নে তুমি আমার বয়ফ্রেন্ড। এবার আমি ক্লাসে যাই।
-- যদি এটাই সত্যি হতো।
-- কিছু বললে।
-- না তুমি ক্লাসে যাও।
-- ওকে
ওর চলে যাচ্ছে আর আমি ওর চলে যাওয়া দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ ও ফিরে তাকালো আর বলল.....
-- পাক্কা আসবে তো।
-- হুমম পাক্কা।
-- আমার জন্য গিফট আনবে তো।
-- হুমম আনবো।
-- ওয়েট করবো কিন্তু...
-- ওকে।
তারপর ও ক্লাসে চলে গেল আর আমিও তূর্য ভাইকে ফোন দিলাম জানতে ওনি এখন কোথায়? ওনাকে সাথে নিয়ে গিফট কিনতে যাবো। কিন্তু ওনার মোবাইল বন্ধ দেখে আমি নিজেই ওনার বাসায় যাই। কিন্তু ওনার বাসায় গিয়ে শুনি ওনি নাকি কোন মেয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে। এটা শুনে একটা ঝাটকা খেলাম। তাই একা একা শপিংমলে গিয়ে একটা আংটি কিনলাম আর বার্থ ডে কার্ড কিনলাম।আর মনের কিছু কথা লেখলাম।
.
গল্পটা বলা শেষ না হতেই রাজ থেমে গেল। এরপর কি হলো ও কিছুই বলছে না। আমি আর দূর্জয় জানতে চাইলাম...
-- কিরে আংটি কিনার পর কি করলি?  আর মাঝ পথে থেমে গেলি কেন?
-- কারন বাকি গল্পটা তোরা দুইজনে লেখবি।
-- মানে?
-- মানে দোস্ত তোরা একটু আমার বাসায় যাবি।
-- কেন?
-- কারন আমার রুমের টেবিলের ড্রয়ারে আংটি আর কার্ডটা রাখা আছে।
-- তুই নিজে আংটিটা দিয়ে আসিস নি।
-- না রে।
-- কেন?
-- কারনটা তোরা আমার বাসায় গিয়েই বুঝবি।
.
আমি আর দূর্জয় কিছুই বুঝতে পারছি না। সব যেন মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। আর এই দিকে সূর্যের মুখটাও দেখা যাচ্ছে। তখনই রাজ বলল...

-- দোস্ত তোরা থাক কিন্তু আমায় যেতে হবে।
-- কোথায় যাবি? আমাদের সাথে বাসায় যাবি না।
-- না রে। আজ আমার থাকার জায়গাটা ব্যবস্থা করতে যাবো।
-- কোথায়?
-- আমার সব প্রশ্নের উত্তর পাবি আমার বাসায় গিয়েই।
-- কিন্তু?
-- কোন কিন্তু না,  এখন তোরা আমার বাসায় যা আর আংটিটা আর কার্ডটা একটু পৌছেঁ দিয়ে আয়।
-- ওকে।
-- আমি গেলাম রে।
আমাদের বসিয়ে রেখে রাজ পিছনের হাটঁতে হাটঁতে চলে যাচ্ছে।
.
আমি আর দূর্জয় রাজের বাড়ির উদ্দেশ্যে যেতে লাগলাম কারন সবটা কেমন যেন কুয়াশার মত লাগছে। রাজের বাসায় এসেই দরজায় কলিং বেল বাজালাম। তারপর রাজের বাবা এসে দরজা খুলে দিলো। হয়ত রাজ আমাদের সাথে মজা করছে তাই জানতে চাইলাম....
-- আঙ্কেল রাজ কোথায়?
-- (ওনি চুপ হয়ে আছেন)
-- জানেন আঙ্কেল রাজ আমাদের সাথে সারাটা রাত কাটালো আর কি যে প্রেমের গল্প বলল....
-- মানে?
ওনি আমাদের সাথে মানে জানতে চাওয়ায় অবাক হয়ে রাতে সব ঘটনা খুলে বলি। এতে আঙ্কেলের চোখে জল চলে আসে আর ওনি আমাদের রাজের ঘরে নিয়ে যায় আর ড্রয়ার থেকে একটা আংটি আর কার্ড বের করে দেয়। এখন আমারও বুকের বাম পাশটা কেমন যেন লাগছে। তাই আমি জানতে চাইলাম......
-- আঙ্কেল রাজ কোথায়?
-- (ওনি কেদেঁই চলেছে)
-- আঙ্কেল কিছু তো বলেন?
-- রাজ গত এক মাস আগে রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে। ওইদিন রাতে আমাকে নিয়ে গেছিল শপিং করিয়ে দেওয়ার জন্য। রাজ একটু সব জলদি করছিল ওই দিনে। ওর নাকি কোথায় দাওয়াত ছিল। তাই আমি ভাবলাম ওর জন্য একটা শার্ট কিনি তাই ওরে একটা শার্ট দিয়ে বললাম টি-শার্টের উপর যেন শার্ট টা পরে দেখে কেমন লাগে। হঠাৎ রাজ বলল " বাবা বাইরে অন্ধ লোকটা মনে হয় রাস্তা পার হতে পারছে না তাই আমি গিয়ে রাস্তা পার করে দিয়ে আসি। " আমিও বললাম যেতে। কিন্তু রাজ যখন লোকটাকে রাস্তা পার করাছিল তখন .........
আঙ্কেলের মুখে ঘটনাটা শুনার পর আমি যেন অন্য রকম জগতে চলে যাই। তখন আমি মোবাইলটা চালু করার চেষ্টা করি। কারন গতকাল ওর সাথে যে ছবি তুলে ছিলাম। কিন্তু মোবাইল কি চালু করবো, মোবাইল তো অনেক আগেই ঠিক হয়ে গেছে। আমি গ্যালারি তে গিয়ে ওর ছবি খুজঁতে লাগলাম। কিন্তু কোন ছবিই পেলাম না। এদিকে রাজের বাবাও কাদছেঁ। তাই আমি ওনাকে জড়িয়ে ধরি।
-- আঙ্কেল রাজ নেই বলে কি হয়েছে? আমরা আরো দুইটা রাজ আছি তো। আপনার কোন সমস্যা হবে না। ওর মত হয়ত আমরা কেউ হতে পারবো না। তবে আমাকে আর দূর্জয়কে রাজের দুইটা হাত মনে কইরেন।চোখের জল যেন থামছেই না।
.
থাকতে না পেরে আংটি আর কার্ডটা নিয়ে চলে আসলাম। আর বিথীর বাসায় চলে গেলাম। প্রথমে অবশ্য ওর মা দরজা খুলল কিন্তু ওর সাথে দেখা করতে চাই বলায় খুব স্বাভাবিক ভাবে বিথীকে ডেকে দিলো।বিথী আসলো কিন্তু মেয়েটার চোখের নিচে কালি জমে আছে।  আর আমরা কার্ড আর আংটিটা ওরে দিলাম। তাই ও বলল...
-- আপনাদের তো ঠিক চিনলাম না।
-- আমরা রাজের বন্ধু।
-- রাজ কোথায়?গত এক মাস ধরে ওর কোন খুজঁ নেই। ওর নাম্বার বন্ধ আর তূর্য ভাইও নেই যে ওর খুজঁ পাবো।
-- ( আমরা চুপ ছিলাম)
-- কি হলো বলেন?
-- রাজ গত এক মাস আগে রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে। ওর ইচ্ছায় এই দুইটা জিনিস তোমায় দিয়ে গেলাম।

বিথী হয়ত কথাটা সহ্য করতে পারে নি তাই মেঝেতে বসে পরেছে আর ওর চোখ দিয়ে শুধু জল পরছে। কিন্তু কোন আওয়াজ করছে না। বিথী আমাদের সামনে কার্ডটা খুলল। যার মাঝে লেখা ছিল " বন্ধু প্রতিটা মানুষের জীবনের অর্ধেক অংশ হয়। আর ভালবাসার মানুষও সেই মানুষের জীবনের বাকি অর্ধেক অংশ হয়। তবে যদি বন্ধু থেকে কেউ ভালবাসার মানুষ হয়ে যায় তাহলে সম্পূর্ণ একটা জীবন পরিপূর্ণ হয়। তাই তোমার জীবনের সম্পূর্ণ অংশ হতে চাই। যে অতীতে ছিল,বর্তমানে আছে আর ভবিষ্যতে থাকবে। "
কার্ডে লেখাটা পরে চোখে ঠিকই জল আসলো। সত্যি হারামীটা ঠিকই বলছে " বন্ধু জীবনের একটা অর্ধেক অংশ হয় "।  রাজ তুই সত্যি ভবিষ্যতেও থাকবি আমাদের মাঝে বেচেঁ।

Post a Comment

Previous Post Next Post