বারান্দায় গ্রিল ধরে জেরিন শেষ বিকেলের অাবছা পরিবেশ দেখছে।
তার মন অাজ অানমনে, কারণ জেরিন এখন অার অাগের মত নেই। সে এখন অন্তঃসত্ত্বা।
তার অস্তিত্বে জড়িয়ে অাছে অারেকটি প্রাণ, অারেকটি নতুন জীবন, অারেকটি নতুন স্বপ্ন। জেরিনের যায়গায় অন্য কোনো মেয়ে হলে সেই মেয়েটি সীমাহীন অানন্দে ডুবে থাকতো। স্বামীর স্নেহ অার পরিবারের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতো ভালোবাসার রাজ্যে।
অথচ জেরিনের বেলায় এসব কিছুই হয়নি, জেরিন বিষণ্ণতায় ভুগছে। সে এই বিষয়টা নিয়ে খুব চিন্তিত। জেরিন অন্তঃসত্ত্বা, এটা জেরিনের জন্য খুবই চিন্তার বিষয়।
.
জেরিনের বিয়ে ঠিক হয়েছিলো কোনো এক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। কিন্তু সে তার ভালোবাসার মানুষটিকে ছাড়া থাকবে এটা জেরিন এক মুহূর্তের জন্যও কল্পনা করেনি। তাই তার ভালোসার মানুষটির হাত ধরে জেরিন তার পরিবার ছেড়েছে।
যে ছেলেটির হাত ধরে জেরিন তার পরিবার ত্যাগ করেছে সেই ছেলেটির নাম জয়।
দ্বীর্ঘ সাত বছরের প্রেমকে জেরিন উপেক্ষা করতে পারেনি, তাই কাউকে কিছু না জানিয়ে এমন এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পথচলা শুরু করেছে যে গন্তব্যের সঠিক রাস্তাটা হয়তো অাজও জেরিন খুঁজে পায়নি।
.
জেরিন তার অন্তঃসত্ত্বা হওয়া নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ হলো জয় এবং জেরিনের এখনো বিয়ে হয়নি।
জেরিন জয়কে অনেক অনুরোধ করেছিলো বিয়ের অাগে তাদের মাঝে কোনো শারীরিক  সম্পর্ক হবেনা। কিন্তু জয়ের লালশার কাছে জেরিন পরাজিত হয়ে নিজের সব কিছু তাকে উৎসর্গ করে দেয় জেরিন।
.
জেরিন জয়ের হাত ধরে এই অচেনা শহরে এসেছে দুই বছর হয়ে গেছে কিন্তু জয় এখনো তার পরিবারকে জেরিনের কথা জানায়নি, অথচ পালিয়ে যাওয়ার অাগে জয়ের কথা ছিলো এক সপ্তাহের মাঝে জয় তার পরিবারকে তাদের দুজনের কথা জানাবে। কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ পেরিয়ে সেটা বছরে রুপ নিয়েছে অাজও জয় তার পরিবারকে কিছু জানায়নি।
.
সন্ধ্যা ঘনিয়ে অাসছে, অন্ধকারের চাদরে ঢেকে যাচ্ছে ইট পাথরের এই রঙিন শহর।
জেরিন বেলকনিতে বসে জয়ের জন্য অপেক্ষা করছে।
অাজ জয় বাড়ি ফিরলে জয়ের পরিবারকে জেরিনের বিষয়টা বলার জন্য জয়কে চাপ দিবে। কারণ জেরিনের ভিতরে এখন নতুন কোনো অস্তিত্ব উকি দিচ্ছে যা তাদের পরিবারকে জানানো দরকার।
.
জয় অার জেরিন বারান্দায় বসে অাছে, চাঁদের অাবছা অালোয় বারান্দার অন্ধকার বিলুপ্ত।
.
-'জয় তোমাকে কিছু বলার ছিলো'
.
জয় হাসি মুখে প্রতিউত্তরে বললো
.
-'কি বলবে?'
.
-'অনেক কিছু বলবো, এবং অাজ তোমাকে অামার কথাগুলো রাখতে হবে।'
.
-'কি এমন কথা যা না রাখলেই নয়?'
.
-'অনেক কথা'
.
-'অাচ্ছা বলো শুনছি'
.
-'জয় অামি অন্তঃসত্ত্বা, অামার দেহে এখন তোমার অামার সন্তান ক্রমাগত বেড়ে উঠছে'
.
মুহূর্তেই যেন সব থমকে গেলো, জয়ের মুখের সেই হাসিটা মুহূর্তেই অাতঙ্কে রুপ নিয়েছে, তীব্র এই অাতঙ্ক জয়কে ক্রমাগতভাবে গ্রাস করে যাচ্ছে।
.
-'কি বলছো তুমি এসব?'
.
-'অামি ঠিকি বলছি, তুমি কাল সকালেই তোমার পরিবারকে অামাদের কথা খুলে বলবে।
অামি চাইনা অামাদের সন্তান বড় পরিবার ছাড়া পৃথিবীতে বড় হওক, অামি চাই অামাদের সন্তান পৃথিবীতে অাসা মাত্রই সে তার পুরো পরিবারের ভালোবাসার ছোঁয়া পাক'
.
জয় কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা, কিইবা বলার অাছে। তার কিছুই বলার নেই, কারণ জয়তো এতদিন জেরিনের সাথে ভালোবাসার অভিনয় করে গেছে জেরিনের সুন্দর দেহটা ভোগ করার জন্য। জেরিনও অবুঝের মত নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে জয় নামক এই পশুর কাছে।
.
-শুনো জেরিন অামি এখনো বেকার, কোথাও জব পাইনি, তাই অামার পরিবারকে এখন কিছু বলা যাবেনা। যতদিন না অামি জব পাই ততদিন অামাদের এভাবে থাকতে হবে।
.
-এভাবে তো দুটি বছর কেটে গেছে, অার কত? তাছাড়া অামার গর্ভে এখন তোমার সন্তান
.
-জেরিন বুঝার চেষ্টা করো, বর্তমানে অামাদের দুজনেরই খেতে চলতে অসুবিধা। তার মাঝে তৃতীয় কেউ অামাদের জন্য অনেক বড় সমস্যার কারণ। তাই...
.
জেরিন জয়কে থামিয়ে দিয়ে বললো
.
-কি বলছো তুমি এসব? তুমি অামাকে খুন করতে বলতে চাইছো? অামি অামার গর্ভের সন্তানকে নষ্ট করবো?
.
জয় সাথে সাথে চুপসে গেছে, জেরিনের কথার কি উত্তর দিবে জয় সেটা ভাবতে লাগলো। অতঃপর কোনো উত্তর ভেবে না পাওয়ায় চুপসে যাওয়াটাই জয়ের মাঝে অস্তিমান থাকলো।
.
বেশ রাত হয়েছে, জয় নির্বাক ভঙ্গিতে জেরিনের দিকে তাকিয়ে অাছে।
জেরিনের চোখ দিয়ে অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ছে চাঁদের অালোয় সেটা স্পষ্ট। কিছুক্ষণ পর জয় জেরিনকে অাশ্বাস দেয়ার মত করে কিছু একটা বলে রুমে নিয়ে গেছে।
.
মধ্যরাত, খোলা জানালা দিয়ে শীতল হাওয়া অাসছে জেরিনের রুমে।
বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে, ঝুম বৃষ্টি। পুরো অাকাশ ভয়ানক মেঘে ঢাকা পরে গেছে। এ মেঘ অাজ অাকাশকে সহজে ছাড়বেনা। হঠাৎ করে বজ্রপাত হলো, জেরিন ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে জয়কে খুঁজার চেষ্টা করলো। কিন্তু জয় বিছানায় নেই।
জেরিন বজ্রপাতে ভয় পায়, যখনই বজ্রপাত হয় জেরিন জয়ের বুকে মাথা লুকিয়ে রাখে।
.
জয়কে বিছানায় না দেখে জেরিন প্রচণ্ড ভয় পেলো, তার পুরো শরীর থর-থর করে কাঁপছে। জেরিন অনেক কষ্টে বিছানা থেকে উঠে অালো জ্বালিয়ে জয়কে খুঁজার চেষ্টা করলো। কিন্তু রুমের কোথাও জয় নেই, নেই তার কোনো স্থিতি।
হঠাৎ জেরিনের চোখ গেলো টেবিলের উপর থাকা একটি চিরকুটের দিকে।
শুকনো গোলাপ দিয়ে চিরকুট টিকে চাপা দিয়ে টেবিলে রাখা হয়েছে।
জেরিন চিরকুটটি হাতে নিয়ে পড়তে লাগলো।
.
"জেরিন অামাকে ক্ষমা করে দিও, অামি অামার পরিবারকে তোমার কথা বলতে পারবোনা। কারণ অামি বিবাহিত।
ছয়-মাস অাগেই পরিবারের পছন্দ করা মেয়েকে অামি বিয়ে করে নিয়েছি। গতসাত বছর ধরে তোমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করেছি শুধু তোমাকে ভোগ করার জন্য, আর অামি সেটা করেছি। এখন তুমি যদি তোমার ভালো চাও তাহলে গর্ভের সন্তানকে নষ্ট করে তোমার বাবা মায়ের কাছে ফিরে যেও।
অামি তোমার জীবন থেকে চলে যাচ্ছি। ভালো থেকো।
____জয়
.
জেরিনের মাথার উপর যেন এই মেঘাচ্ছন্ন অাকাশটা ভেঙ্গে পরলো, জেরিন সাথে সাথে ফ্লোরে বসে পরলো।
জেরিন কাঁদছে, চিৎকার করে কাঁদছে।
কিন্তু এই মধ্যরাতে তার কান্নার শব্দ এই চার দেয়ালকে ভেদ করে কারো কানে পৌঁছাবে না।
.
পূর্ব অাকাশে সূর্য উকি দিচ্ছে, শিশির ভেজা সকালের সোনালী রৌদ্র জেরিনের ঘরে ঢুকে অালো দিচ্ছে। এই ঘরে এখন অার জেরিন নামক কেউ নেই। অাছে শুধু একটি লাশ, ঝুলন্ত লাশ। যে লাশের নাম জেরিন অাহমেদা মুক্তা।

Post a Comment

Previous Post Next Post