--
নতুন বাসায় উঠলাম দুই দিন হলো। বাসাটা আমার অনেক পছন্দ হয়েছে, কারন বারান্দায় দাঁড়ালে পড়ন্ত বিকেলের অপূর্ব সৌন্দর্যটা খুব সহজেই উপভোগ করা যায়, তার সাথে রয়েছে হালকা বাতাসের ছোয়া। সব মিলিয়ে একটা আসাধারন পরিবেশ সৃষ্টি হয় যেটা আমার অনেক পছন্দের। আমি মুন, সবে মাত্র ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। বাড়িটা ভার্সিটি থেকে অনেক দূরে হওয়ার কারনে লিমার সাথে বাসায় উঠা। লিমা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, দুইজন একই ভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্টে পড়ি। রাত প্রায় একটা ঘনিয়েছে, কিন্তু কোনো ভাবেই ঘুম আসছে না নতুন পরিবেশ হয়তো তাই। রাতের আধারে ব্যর্থ তারা গুনার অভ্যাসটা সেই ছোট বেলা থেকেই আর এখন সেই ব্যর্থ কাজটিই সম্পূর্ণ করতে ছাদে উঠলাম। ছাদের পরিবেশটাও খারাপ না মোটামুটি সুন্দরই ছাদের এক কোনে টবে টবে অনেক গুলো গোলাপ ফু্ল গাছ লাগানো আছে, দু'একটা গাছে কলিও এসেছে। ছাদের এক কোনে দাড়িয়ে তারা গুনার বৃথা চেষ্টা করছিলাম, হালকা বাতাসে অবাধ্য চুল গুলো উরছে। এমন সময় হঠাৎ করে কোথা থেকে যেনো এক মনকাড়া গিটারের সুর ভেসে আসছিলো। অসাধারন এক সুর, মূহুর্তেই কারো মন কারার জন্য এই সুরটাই যথেষ্ট। পেছন ফিরে দেখি সামনের বাসার ছাদ থেকে সুরটা ভেসে আসছিলো, একটা ছেলে ছাদে বসে গিটার বাজাচ্ছে। অন্ধকারের কারনে চেহারাটা ভালো ভাবে বুঝা যাচ্ছিলো না। মুগ্ধ হয়ে তার গিটারের সুর শুনছিলাম, যেনো একটা ঘুরের মধ্যে আছি। হঠাৎ করে সুরটা বন্ধ হয়ে গেলো আর আমারও জেনো ঘোর কেটো গেলো। তাকিয়ে দেখি ছেলেটি আর নেই, মূহুর্তের মধ্যে কোথাও উদাও হয়ে গেলো। চোখেও ঘুম চলে আসে যার কারনে ছাদ থেকে রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম।
,
পরদিন ব্যস্ততার কারনে ছেলেটির কথা আর মনে পড়ে নি। সারা দিনের ব্যস্ততায় খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যার কারনে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম চলে আসলো। কিন্তু রাত একটার নাগাত আবারও সেই গিটারের সুর কানে ভেসে এসে লাগলো, ঘুম ভেঙ্গে গেলো। সুরটা যেনো আমাকে ডাকছিলো, আর আমি ও ঘরে থাকতে পারলাম না,ছুটে ছাদে চলে গেলাম। ছাদের এক কোনে দাড়িয়ে তার বাজানো সুর শুনছিলাম কিন্তু আজও কালকের ন্যায় ছেলেটা মূহুর্তের কোথাও যেনো হারিয়ে গেলো। আর এমনটা শুধু একদিন না প্রতিদিনই হতো!! রাত ঠিক একটার সময় তার বাজানো গিটারের সুরটা আমাকে ছাদে আসতে বাধ্য করতো কিন্তু সুরটা শেষ হতেই ছেলেটা কোথায় যেনো হারিয়ে যেতো, আর এটা আজ কিছু দিন ধরেই হয়ে চলেছে। লিমার সাথে ব্যাপারটা শেয়ার করাতে ও বলে যে এটা নাকি আমার মনের ভুল। কিন্তু আমি খুব ভালো করেই জানি যে এটা আমার মনের ভুল নয়, তাই ঠিক করেছি আজ আমি যেইভাবেই হোক ছেলেটার সাথে কথা বলবই। ঘড়িটা হাতে নিয়ে বসে আছি কখন একটা বাজবে আর কখন সেই সুরটা আমাকে ডাকবে। একটা না বাঝতেই সুরটা ভেসছে আসতে লাগলো, ছাদে গিয়ে দেখি আজও ছেলেটি ওই জায়গায় বসে গিটার বাজাচ্ছে....
,
--এই যে শুনছেন
আরে আপনাকে বলছি কথা বলছেন না কেনো?
এই যে মি. গিটারিস্ট (আমি)
--_____(গিটার বাজানো বন্ধ করে দিলো)
--কি হলো?
--____(ছেলেটি পিছন ফিরে তাকালো)
--যাক, শুনেছেন তাহলে
--আমাকে বলছেন(ছেলেটি আশেপাশে তাকিয়ে বললো)
--আপনি ছাড়া কি এখানে কেউ আছে?
--না,,,
--আচ্ছা বাদ দিন। আপনি কিন্তু খুব ভালো গিটার বাজান, প্রতিদিন আপনার এই গিটারের সুর আমাকে এখানে টেনে নিয়ে আসে কিন্তু কিছুক্ষন পর আপনি মূহুর্তের মধ্যে হাওয়া হয়ে যান।
--ওহ, সরি
--না, ঠিক আছে। আপনি নিশ্চয় এই বাসায় থাকেন?
--হে, ১২ নাম্বার ফ্ল্যাটে
--আমি মুন, আর আপনি?
--অভি
--কি করেন? লেখাপড়া নাকি চাকরি
--গিটার বাজাই
--হিহিহিহিহি,,,খুব রোমান্টিকতো আপনি। আমি না একটু বেশি কথা বলি প্লিজ আপনি কিছু মনে করবেন না
--হুম
--তাহলে আজ থেকে আমরা ফ্রেন্ড
--হুম, আমায় এখন যেতে হবে। আর থাকতে পারবো না
,
কথাটি বলে ছেলেটি চলে যায়। ছেলেটা খুব অদ্ভুত ধরেন, কথা বার্তা গুলো কেমন জানি; তবে আমার অনেক ভালো লেগেছে। কারন অদ্ভুত ব্যপারটা যে বরাবরই আমার অনেক পছন্দের। ওই দিনের পর থেকে প্রতিদিনই অভির সাথে কথা হয়, তবে ঠিক রাত একটার পর তাও সামান্য কিছু মূহুর্তের জন্য। তার বাসার বারান্দার দরজা জানালা সব সময় বন্ধ থাকতো, বাসায় আলো জ্বলতেও দেখা যেতো না। কারন জানতে চাওয়াতে বলে যে তার নাকি আলো ভালো লাগে না; ভালোই হয়েছে আমারও আলো ভালো লাগে না...
,
--আচ্ছা তোমার বাসায় আর কে কে আছে?(আমি)
--সবাই আছে, চাঁদ, তারা, আকাশ,
--হিহিহিহিহিহিহি
--কিরে এতো রাতে তুই এখানে কার সাথে কথা বলছ??(লিমা)
--অভির সাথে
--অভি, কই আমিতো এখানে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না
--এইতো(পেছন ফিরে দেখি অভি নেই)
চলে গেছে হয়তো
--তোর মাথা। এইখানে অভি টভি কেউ ছিলো না আর চলেও যায় নি, চলতো অনেক ঘুম পাচ্ছে
--হুম
,
অভি না গেলেই পাড়তো, শুধু শুধু লিমার কাছ থেকে অনেকগুলো কথা শুনতে হলো। আর একটু সময় থাকলে কি এমন ক্ষতি হয়ে যেতো?
,
--কিরে এখনো জেগে রইলি যে(লিমা)
--আচ্ছা আমার জন্মদিনের আর কয়দিন বাকি?(আমি)
--চার দিন, কেনো?
--আমার জন্মদিনের পার্টিতে অভি সবাইকে গিটার বাজিয়ে শুনাবে
--তোর এই পাগলামি বন্ধ করবি, ও আসবে না
--আসবে, আমি কালকেই তার বাসায় গিয়ে তাকে দাওয়াত দিবে আসবো।
--যা ইচ্ছা তা করিস এখন ঘুমাতো
--হ্যা করবো।
,
পরদিন ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে অভির বাসায় গেলাম। বাসার সামনে গিয়ে বেল বাজাতে লাগলাম কিন্তু কেউ দরজা খুললো না, মনে হয় অভি বাসায় নেই। এমন সময় সিড়ি দিয়ে একজন লোক নিচে যাচ্ছিলো,,,,
,
--আংকেল অভি কোথায় গেছে একটু বলতে পারবেন?(আমি)
--অভি???(লোকটি একটু অবাক হয়ে)
--এই বাসায় যে থাকে, অভি!! খুব ভালো গিটার বাজায়
--শুনো মা, দুই বছর ধরে এই বাসায় কেউ থাকে না। তবে হ্যা দুই বছর আগে একটা ছেলে থাকতো, সে একাই থাকতো কিন্তু মাঝে মাঝে তার সাথে একটা মেয়ে আসতো। কিন্তু কি এমন হলো ছেলেটা একদিন আত্মহত্যা করে, হায় রে কপাল। খুব ভালো ছিলো ছেলেটা, কি থেকে কি হয়ে গেলো!! ওই দিনের পর থেকে এই বাসায় আর কেউ থাকে না। যেই থাকতে আসে তার সাথে একটা না একটা দূর্ঘটনা হবেই, তাদের কথা মতো এখানে নকি আত্মা আছে।আর ছেলেটাও না খুব ভালো গিটার বাঝাতো, মন ছুয়ে যেতো,,,
,
লোকটি কথাগুলো বলে চলে গেলো। তার মানে আমি এতো দিন যার সাথে কথা বলেছি সেটা একটা আত্মা ছিলো!!! ভাবতেই হাত পা কেমন ঠান্ডা হয়ে আসছিলো। ভয়ে কাপতে শুরু করেছিলাম, বাসায় যাওয়ার জন্য হাটতে শুরু করলাম কিন্তু কেনো জানি পা'ই চলছিলো না। অনেক কষ্টে বাসার সামনে গিয়ে বেল বাজালাম এবং সাথে সাথে জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করলাম, পাশে লিমা বসে আছে,,,
--লিমা, অভি?(আমি)
--এতো জ্বর নিয়ে ভার্সিটিতে যাওয়ার কি দরকার ছিলো?(লিমা)
--অভি(খুব ভয়ে কাপতে কাপতে)
--চুপ একটা কথাও বলবি না, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে আর ওনি অভি অভি করছে? কি হয়েছে অভির হ্যা,
--অভি মারা গেছে
--কি,,,,, কবে???
--দুই বছর আগে
--মানে?? জ্বরের ঘোরে কি সব উল্টা পাল্টা বকছিস?
--সত্যি...(লিমাকে সব খুলে বললাম)
--শুন এই সব আত্না টাত্মা কিছু হয় না। এই সব তোর মনের ভুল আর আজ থেকে তুই আর কখনো ছাদে যাবি না
--সত্যি আমি দেখেছি
--দেখেছিস ভালো করেছিস এখন একটু বিশ্রাম নে, প্লিজ
,
জ্বরটা কিভাবে কখন আসলো বুঝতেই পারলাম না। আমি কি সত্যিই অভির আত্মাকে দেখেছিলাম নাকি আমার মনের ভুল ছিলো? এই সব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতেই পারলাম না। কিন্তু আজ আবারও সেই সুর কানে ভেসে আসছিলো, ঘুম থেকে লাপ দিয়ে ওঠে বসলাম, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি একটা বাজে। সুরটা কেমন জানি আমাকে পাগল করে দিচ্ছে তবে না আজ আমি যাবো না, কোনো ভাবেই না। কিন্তু আমি আর পারছি না, সুরটা কেমন যেনো আমায় টানছিলো শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরে ছুটে গেলাম ছাদে,,,
,
--বন্ধ করো এই সুর(চিৎকার করে বললাম)
--____(গিটার বাজানো বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে)
--কে আপনি? কি চান আমার কাছে? আর কেনই বা আমাকে এই ভাবে ছুটে আসতে বাধ্য করেন?
--কারন তুমিই পারবে আমাকে মুক্তি দিতে
--মানে? কে আপনি
--অভি
--অভিতো দুই বছর আগেই আত্মহত্যা করেছে
--না ও আত্মহত্যা করে নি!! তাকে হত্যা করা হয়েছে....হত্যা
--মানে???আর আপনি বা কি করে জানেন?
--আমিই অভি,,,অভির আত্না....আজ থেকে দুই বছর আগে, আমি একজন ফটোগ্রাফার ছিলাম। সেই সুবিধেই অনুপমার সাথে আমার পরিচয় হয়, মডেল হওয়ার তার খুব ইচ্ছে ছিলো। আর সেটা যেকোনো মূল্যেই সে চেয়েছিলো। যার জন্য সে আমাকে ব্যবহার করে, আমার সাথে ভালোবাসার ছলনা করে। কিন্তু আমি কখনো সেটা বুঝতেই পারি নি,অন্ধের মতো তাকে বিশ্বাস করে গেছি। কিছু দিনের মধ্যেই সে খুব জনপ্রিয় হয়ে গেলো, দেশে তার নাম ছড়িয়ে পড়লো। অনুপমা লুকিয়ে আমাকে বিয়ে করেছিলো, কিন্তু জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর সে আমাদের বিয়েটা অস্বীকার করতে শুরু করে। আর আমি তাকে কোনো ভাবেই হারাতে চাইনি, যার কারনে তাকে ভয় দেখাতে শুরু করি যে সে যদি বিয়েটা অস্বিকার করে তাহলে আমি বিয়ের সব প্রমান মিডিয়াকে দেখিয়ে দিবো। অনুপমা ভয়ে বিয়েটা মেনে নিয়েছিলো কিন্তু মন থেকে নয়...গিটার বাজানোটা আমার একটা সখ ছিলো। প্রতিদিন রাতেই এখানে বসে গিটার বাজাতাম আর দুজনে বসে কফি খেতাম। ওই দিনও তাই করছিলাম, আর অনুপমা পাশে বসে গিটারের সুর শুনছিলো। কেমন জানি হঠাৎ করে মাথাটা ঘুরতে শুরু করলো কারন অনুপমা ওই দিন কফিতে ঘুমের ঔষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলো যা আমি বুঝতে পারি নি। রুমে যাওয়ার জন্য বসা থেকে উঠে দাড়াতেই মাথাটা যেনো আরো বেশি ঘুরতো শুরু করে। আর তখনি অনুপমা আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়...সকল প্রমান মুছে পুলিশকে টাকা দিয়ে এটা আত্মহত্যা বলে সবাইকে জানিয়ে দেয়। সবাই জানে মারা গেছি আমার আত্মাটা যে আজও মুক্তি পায় নি। দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে যায়, কিন্তু কেউ আমাকে দেখে না আমার কথাও শুনে না। তারপর তুমি এলে আমাকে ডাকলে, আমার সাথে কথা বললে। তখনি বুঝেছি যদি আমাকে কেউ মুক্তি দিতে পারে তাহলে সেটা হচ্ছে তুমি
--কিন্তু আমি কেনো??অন্য কেউতো হতে পারতো
--বিধাতা হয়তো এইটাই চায়
--আমি পারবো না। প্লিজ আমাকে আর ডাকবেন না
--আমাকে মুক্তি দিয়ে দিন। তাহলে আমি আর তোমাকে ডাকবো না
--আচ্ছা ঠিক আছে বলুন কি করতে হবে
--কাল ঠিক রাত একটার সময় অনুপমাকে এখানে নিয়ে আসতে হবে
--এটা কিভাবে সম্ভব???এতো বড় একজন মডেল আমার কথায় এখানে কেনো আসবে??
--আসবে, আমি জানি তুমি ঠিক পারবে
--তবে হ্যা আপনি তার কোনো ক্ষতি করতে পারবেন না
--হুম....(মূহুর্তের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেলো)
,
রুম এসে ভাবতে শুরু করলাম কিভাবে অনুপমাকে অভির আত্মার কাছে নিয়ে আসা যায়। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম, সকালে ঘুম থেকে উঠেই অনুপমার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম; তবে ওনি আমার সাথে দেখা করবে তো?
~~মি.গিটারিস্ট
ভাবতেই অবাক যে ওনার মতো একটা জনপ্রিয় মডেল কারো খুন করতে পারে। মানুষ যে নিজের স্বার্থের জন্য এতোটা নিচে নামতে পারে সেটা আগে জানা ছিলো না। এই সব ভাবতে ভাবতে কখন যে অনুপমার বাসার সামনে পৌছে গেছি বুঝতেই পারলাম না। বাসার ভিতরে ডুকতেই দারোয়ান বাধা দিলো, এটাই স্বাভাবিক,,,
.
--কি চাই এখানে?(দারোয়ান)
--এটা অনুপমার বাসা না?(আমি)
--হুম, কেনো?
--আমি তার সাথে দেখা করতে এসেছি
--ম্যাডাম যার তার সাথে দেখা করে না, শুধু শুধু কথা না বাড়িয়ে চলে যান এখান থেকে
--প্লিজ এমন করবেন না! ওনার সাথে দেখা করাটা আমার খুব দরকার
--আপনাকে আমি কি বলছি কথা কানে যায় না? যান বলছি এখান থেকে
--শুধু পাঁচটা মিনিটের জন্য দেখা করতে দিন প্লিজ
.....দোতলার বারান্দা থেকে কেউ একজন দারোয়ানকে ডাক দিলো। তাকিয়ে দেখি সে আর কেউ নয় ও হচ্ছে অনুপমা.....
--কি হয়েছে এখানে??(অনুপমা)
--ম্যাডাম এই মেয়েটি সেই কখন ধরে বলে যাচ্ছে আপনার সাথে দেখা করাটা নাকি তার খুব দরকার(দারোয়ান)
--ভিতরে পাঠিয়ে দাও(এই বলে সে বারান্দা থেকে চলে যায়)
--ভিতরে যান(দারোয়ান আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো)
.
বসার রুমে বসে অনুপমার জন্য অপেক্ষা করছি আর ভাবছি ওনি আমার সাথে যাবে তো,,,,,
,
--চা, কপি কিছু নিবে?(অনুপমা)
--(অনুপমার এই কথাটি শুনে খুব অবাক হলাম)
--কি হলো?
--না,,ধন্যবাদ
--ওকে, তা কি জেনো বলবে বলছিলে?
--আমি না আপনার অনেক বড় মানের একজন ফ্যান......(ওনাকে ইম্প্রেস করার জন্য বানিয়ে বানিয়ে আরও কিছু বললাম)
--বুঝলাম, তা এখন কাজের কথায় আসো কেনো এসেছো? কোনো সাহায্য লাগবে
--না মানে কাল আমার জন্মদিন । আপনি। আর যার কারনে ছোট খাটো একটা পার্টি দিচ্ছি আপনি যদি পার্টিতে জয়েন করতেন তাহলে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো,প্লিজ না করবেন না
--তো এই ব্যাপার। সাধারনত আমি এই ভাবে কোথাও যাই না তবে হে তোমার সাথে যাবো। কারন একজন বলেছে, আজকের দিনে আমি যদি কারো কোনো ইচ্ছা পূরন করি তাহলে কালকের দিনে আমার জন্য নাকি বিশেষ কিছু অপেক্ষা করছে, তাই তোমার ইচ্ছেটা পূরন করে দেখতে চাই আমার জন্য কি এমন বিশেষ জিনিস অপেক্ষা করছে
--ধন্যবাদ...কথাটা রাখার জন্য। আজ রাত বারোটার সময় যাচ্ছেন তাহলে
--আজ রাত বারোটা কেনো? তোমার জন্মদিন তো কাল
--না মানে, রাত বারোটার পর তো কালকের দিনটা শুরু হবে আর তাই আর কি..
--ওহ, ঠিকানাটা দিয়ে যাও আমি সময় মতো পৌছে যাবো
--ঠিকানা!! কি করি এবার ঠিকানা বললে তো ভুলেও যাবে না,(একটু আস্তে)
--কিছু বললে
--জ্বি ঠিকানা
--হে
--আপনার মতো একটা বড় মনের মানুষকে আমি নিজে এসে নিয়ে যেতে চাই
--ওকে, ঠিক আছে
--এখন তাহলে আসি, আমি পড়ে আসবো
,
এই বলে ওইখান থেকে চলে আসলাম। যাক বেঁচে গেলাম, ভাবতে পারি নি এতো সহজে ওনি মেনে যাবে। তবে হ্যা বিশেষ কিছু তো তার জন্য ঠিকই অপেক্ষা করছে। অনুপমা যখন অভি মানে অভির আত্নাকে দেখবে কি হবে তখন? ভেবেই পুরো হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কতোগুলে মিথ্যা কথাই না এখন বলতে হলো! জন্মদিন কোথায় দুই দিন পর আর বললাম কাল। অনুপমাকে দেখে কতো ভালো মনে হয় কিন্তু ভিতরে যে এতো কিছু তা বাহির থেকে বুঝার কোনো উপায় নেই। এতো কিছু ভেবে আমার আর কাজ নেই, ভালোই ভালোই সব মিটে গেলেই হয়।
.
রাত প্রায় একটার কাছাকাছি। অনুপমা আমার সাথেই, গাড়ি থেকে নামলাম মাত্র।
,
--আচ্ছা এই জায়গাটা কোথায়(অনুপমা)
--কেনো?(আমি)
--খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে!! আমি এখানে আগেও মনে হয় এসেছি
--কি যে বলেন না? আপনি এখানে কেনো আসতে যাবেন! চলুন সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে
--সেটাই ভালো
,
অনুপমাকে আমার বাসায় না নিয়ে অভির কথা মতো তার বাসায় নিয়ে আসলাম। সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম, অনুপমার দিকে তাকিয়ে দেখি সে খুব ভয় পেয়ে আছে হয়তো পুরানো কথাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। স্তব্ধ পরিবেশ, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, চারদিক অন্ধকার এমন সময় অভির বাজানো সেই গিটারের সুর ভেসে আসছিলো,
,
--এই সুর???(অনুপমা ভয়ে ভয়ে আমাকে জিজ্ঞাস  করলো)
--গিটারের সুর? আমার একটা ফ্রেন্ড সে খুব ভলো গিটার বাজাতে পরে ও হয়তো বাজাচ্ছে
--ওহ, কেনো
--এমনিতে(অনুপমা ভয়ে ঘামতে শুরু করলো)
--কি হলো চলুন
--সবাই এতো চুপ কেনো কোনো আওয়াজ নেই
--না মানে পার্টি টাতো ছাদে আর সবাই হয়তো গিটারের সুর শুনছে
,
অনুপমা ছাদে পা রাখতেই হঠাৎ করে আচমকা বাতাস আসতে শুরু করলো, সাথে খুব ভয়ংকর আওয়াজ। আমি ছাদে পা রাখতে যাবো এমন সময় ঠাস করে ছাদের দরজা নিজে নিজে বন্ধ হয়ে গেলো, দরকা দাক্কাতে শুরু করলাম কিন্তু কেউ দরজা খুললো না এমনকি অনুপমাও না। দরজার ওপাশ থেকে অনুপমার চিৎকার ভেসে আসছিলো, ভয়ে আমার পুরা হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কি করবো বুঝতে পারছি না। অনুপমার সাথের অভির আত্মাটা যদি খারাপ কিছু করতে তাকে যদি মেরে পেলে। এই সব ভাবতে ভাবতে কাপঁতে শুরু করলাম। ছাদে কি হচ্ছে তা দেখার জন্য দৌড়ে গিয়ে নিজের বাসার ছাদে গেলাম। অভির আত্না অনুপার দিকে এগিয়ে আসছিলো আর সে আস্তে আস্তে পিছনে যাচ্ছিলো। অনুপমা অভির কাছে  তার ভুলের জন্য ক্ষমা চাচ্ছিলো কিন্তু অভির আত্না কিছুই বলছিলো না শুধু তার দিকে এগিয়ে আসছিলো। আমার কন্ঠ দিয়ে কেমন জানি কোনো শব্দই বাহির হচ্ছিলো না, শুধু দেখেই যাচ্ছিলাম। অনুপমা পিছনে আসতে আসতে ছাদের একদম শেষ পান্তে চলে আসে এবং ছাদ থেকে পড়ে যায়। সাথে সাথে অভির আত্নাটাও কোথায় জেনো হারিয়ে যায়। ভয়ে আমিও জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান পিরে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করলাম, পাশে লিমা বসে ছিলো.....
--কি রে এখন কেমন লাগছে?(লিমা)
--আমি এখানে কিভাবে(বিছানা থেকে ওঠে বসতে চাচ্ছিলাম কিন্তু পারছিলাম না খুব জ্বর অনুভব করলাম)
--ছাদে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে ছিলি, সকালে পাশের বাসার আন্টি ছাদে গিয়ে তোকে দেখতে পায়। আর তুই রাতে বাসায় না এসে ছাদে গিয়েছিলি কেনো?
....বাহির থেকে খুব আওয়াজ আসছিলো....
--এতো আওয়াজ কিসের
--আরে জানিস মডেল অনুপমা আছে না কাল রাতে সামনের বাসার ছাদ থেকে লাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে,,,যার জন্য পুলিশ মিডিয়া সব এসেছে।আর তুই তো ছাদেই ছিলি!!! তুই কি কিছু দেখেছিস
--হুম,,,,না দেখি নি। আমি আর এই বাসায় থাকবো না।
ওই রাতের ঘটনার পর ঠিক করে নিয়েছিলাম যে ওই বাসায় আর থাকবো না। যার জন্য আজ আবারো নতুন বাসায় ওঠা, ভেবেছিলাম নতুন বাসায় ওঠলে ওই ঘটনাটার কথা হয়তো বেশি মনে পড়বে না। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠলো না, প্রতি দিন প্রতি মূহুর্ত ওই ঘটনাটা যেনো আমাকে পিছু করে যাচ্ছিলো। অনুপমার মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ি!! আমি যদি অভির আত্নার কথা মতো তাকে ছাদে নিয়ে না যেতাম তাহলে আর আজ এতো কিছু হতো না। নিজেকে কেমন জানি খুব অপরাধি অপরাধি মনে হচ্ছে। ভার্সিটিতে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছি, নিজেকে যেনো একটা ঘরের মধ্যে বন্ধী করে রেখেছিলাম...
,
--কি হয়েছে তোর বলবি?(লিমা)
--____(এক দৃষ্টিতে জানলার ফাঁক দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে রইলাম)
--মুন!!(একটু দাক্কা দিয়ে)
--হুম(একটু অবাক হয়ে)
--কিরে কোন জগতে বসবাস করিস তুই???
--কেনো?
--চল...
--কোথায়?
--কোথায় আবার ভার্সিটিতে
--আমি যাবো না তুই যা
--যাবি না মানে!! আজ তোকে যেতেই হবে
--প্লিজ জোর করিস না
--জানি না তোর হঠাৎ করে কি হয়েছে, আমাকে যদি বলতে না চাস তাহলে জোর করবো না!! তবে প্লিজ এইভাবে নিজেকে কষ্ট দিস না
--আরে তেমন কিছু না। আচ্ছা ঠিক আছে ভার্সিটিতে যাবো
--ওকে তাহলে রেডি হয়ে নে। আজ সবাই মিলে অনেক আড্ডা দিবো, অনেক দিন পর সবাই আজ একসাথে হচ্ছি।
,
ক্যাম্পাসের এক কোনে বসে বন্ধু সবাই আড্ডা দিচ্ছিলো, আমিও তাদের মধ্যে আছি কিন্তু মনটা পড়ে রয়েছে অভির সাথে কাটানো ওই রাত গুলোর মাঝে। সত্যি কথা বলতে ওই কয়েকদিনে অভিকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম। রাতের আধারে, তারার আলোয়, জোনাকিদের সঙ্গী করে কাটানো মুহূর্ত গুলো যে খুব মনে পড়ে।
,
--এই মুন, কি হয়েছে রে তোর?(নিরব...আমার ফ্রেন্ড)
--_____(বসে বসে অভির কথা ভাবছিলাম)
--কিরে???কি হলো(একটু দাক্কা দিয়ে)
--হুম, কিছু বললি?
--ব্যপার কি বলতো?
--কিছু না....(কথাটি বলে পাশে তাকিয়ে পুরা চোখ আটকে গেলো)
,
একটু দুরে যেনো আমি অভিকে দেখতে পেলাম। কিন্তু দৌড়ে ওইখানে গিয়ে তাকে আর দেখতে পেলাম না, মনের ভুল ছিলো হয়তো আমার...
,
--কিরে এইভাবে চলে আসলি যে?(লিমা)
--এমনিতে, বাসায় যাবো।
--আর একটু থাক না
--না
--তুই যা, আমার একটু কাজ আছে। কাজটি সেরে তারপর আমি যাবো
--ঠিক আছে...
.
বাসায় বসে থাকতে ভালো লাগছিলো না, তাই নদীর পাড়ে দাড়িয়ে নদীর কলরব শব্দ শুনছিলাম। সন্ধ্যে নামতে চলেছে, হালকা বাতাসে চুল গুলো উরছিলো। এমন সময় কেউ একজন পিছন থেকে....
,
--কেমন আছো?
--_____(পিছন দিকে ফিরে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম...কারন লোকটি ছিলো অভি,, না অভির আত্না)
--অবাক হচ্ছো?
--তু...মি(ভয়ে ভয়ে)
--হুম আমি?ভয় পেয়ো না আমি কোনো আত্না নই
--মানে??কি বলছো এইসব তুমি অভি
--না অভি নয় আদি!!! অভির জমজ ভাই
--আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না
--এটাই স্বাভাবিক
--মানে। একটু পরিষ্কার করে বলবেন প্লিজ আপনি কে?
--শুনো তাহলে,,,, আমি অভির জমজ ভাই আদি। দেশের বাহিরে থাকতাম, দুই বছর আগে যখন শুনতে পেলাম অভি আত্নহত্যা করেছে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। কারন আমি জানতাম আর যাই হোক অভি কখনো আত্মহত্যা করার ছেলে সে নয়। তাই পুরো ব্যপারটা জানার জন্য আমার দেশে আসা। অনুপমার কথা অভি আমাকে আগেই বলেছিলো, আর দেশে ফিরে অভির মৃত্যুর রহস্য খুজতে গিয়ে অনুপমাই অভির খুন করেছে। আর এর প্রমাণও আমার কাছে ছিলো যা আমি পুলিশের কাছে তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু অনুপমা পুলিশকে টাকা দিয়ে সব
প্রমাণ তার বিরুদ্ধে করে নিয়েছিলো। অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনো ভাবেই অনুপমাকে তার প্রাপ্য শাস্তি দিতে পারি নি। আর ওই দিন থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলাম ও আমার ভাইকে যেভাবে মেরেছিলো আমিও তাকে ঠিক সেই ভাবেই মারবো। মাঝে মাঝে অভির বাসার ছাদে গিয়ে অভির গিটারে তার বাজানো সুর তুলতাম। ওই রাতেও তাই করছিলাম, এমন সময় তুমি আমাকে ডাক দিলে। আর তখনি মাথায় প্ল্যান আসে তোমাকে দিয়েই অনুপমাকে এখানে এনে তার উপযুক্ত শাস্তি দিবো। তারপর কি হয় বাকিটা তো তুমি সবই জানো।
--বুঝলাম, কিন্তু ওই আংকেলটা যে আমায় বললো
--ওনি ওই বাসার দারোয়ান। ওনাকে কিছু টাকা দিয়ে বলেছিলাম তোমাকে যেনো ওই কথাগুলো বলে।
.
স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছি, কি থেকে কি হয়ে গেলো বুঝতে পারছিলাম না, কখনো কল্পনাই করতে পারি নি যে এমন কিছু হবে, আজানা কারনে কেনো জানি চোখে দু ফোটা পানি চলে আসলো...
,
--কি হলো??(আদি)
--সব কিছু তো তোমার প্ল্যান মতই হয়েছে তাহলে কেনো আজ আমার ভার্সিটিতে গিয়েছিলে(আমি)
--শুধু আজ নয় প্রতিদিনই যেতাম কিন্তু তুমি যেতে না। তার উপর বাসাও বদলে ফেলেছিলে
--কিন্তু কেনো
--যদি বলি ভালোবাসি
--কি???
--হুম ভালোবাসি তোমাকে। ওই কয়েকদিনে তোমাকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি, I Love You
--আমি ভালোবাসি না তোমায়
--কিন্তু তোমার চোখ যে অন্য কথা বলছে
--আমি কোনো খুনিকে ভালোবাসি না
--কিন্তু মুন, আমি তো ভুল কিছু করি নি। আমি তো শুধু তাকে তার প্রাপ্য শাস্তি টা দিয়েছি
--তুমি কেনো ওটা পুলিশ, আদালত দিতো
--তুমি জানো এটা কখনোই হতো না
--তবে তুমি হয়তো এটা জানো না যে, সবসময় সত্যরই জয় হয়।
--আচ্ছা ঠিক আছে, আমি যদি পুলিশকে এখন সব বলে দেই তাহলে কি তুমি আমাকে ভালোবাসবে??? অপেক্ষা করবে আমার জন্য?
--মানে??
--অপেক্ষা করবে কি না বলো?
--করবো
--ঠিক আছে(আদি কাকে যেন কল করতে লাগলো)
--কাকে কল দিচ্ছো?
--পুলিশ কে
,
কিছুক্ষনের মধ্যে পুলিশ চলে আসলো, আদি পুলিশকে সব খুলে বললো। সব কিছু শোনার পর পুলিশ আদিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে নিজেকে সমলানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম...
,
--আদি(দৌড়ে গিয়ে তাকে কাদতে কাদতে জরিয়ে ধরলাম)
--এই পাগলি মেয়ে কাদঁছো কেনো। খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে ফিরে আসবো(আদি)
--ভালোবাসি তোমাকে
--জানিতো...এখন কান্না থামাও
--আমি তোমার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করবো
,
পুলিশ আদিকে নিয়ে যাচ্ছিলে, আমি দাড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখছি। চারদিক অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিলো সাথে আমার জীবনটাও। তবে হ্যা এটা জানি জোনাকির আলোর মতো আদিও আর জীবনের অন্ধকার আলোকিত করতে একদিন ঠিক আসবে। আমি সেই দিনের অপেক্ষা করে যাবো সারাজীবন.......

Post a Comment

Previous Post Next Post