ছোটবেলায় যখন নানু বাড়িতে বেড়াতে যেতাম, তখন পাশের বাড়ির আরেকটা নানু ছিল। যে আমাকে দেখেই বলতো...
-- এমা শাওনতো অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন তো তাহলে বিয়া করাইয়া দেয়া লাগে।
বিয়ের কথা শুনে সাথে সাথে গালে হাত দিয়া বসে পরতাম।
ভাবতাম ইসস বিয়াটা যে কবে করমু।
আর ধীরে ধীরে বড় হতে হতে আশেপাশের কাপলদের দেখে বিয়ের আসল প্যারাটা বুঝতে পারলাম।
এখন বিয়ার কথাটা মনে আসলেও মনে মনে দোয়ায় ইউনুস পড়ি।
এখন নানু বাড়ি বেড়াতে গেলে সেই নানুটা বলে....
-- একিরে শাওনের তো গোফ দাড়িতে মুখ ভরে গেছে।এবার নানুভাইরে বিয়া করাইতেই হবে....
তখন গালে হাত দিয়া বসে বসে ভাবি.."ক্যান যে বড় হইলাম"?
এদিকে আমার চাচাতো ভাইয়ের শালার কান্ড কারখানা দেখে ভাবলাম বিয়া যদি করিও এমন জায়গায় করবো যেখানে কোনো শালা/শালি থাকবে না।শালা মানেই এক্সটা প্যারা।
তাছাড়া বন্ধু বান্ধবদের শালা ডাকতে ডাকতে শালা জিনিসটার প্রতি বিরক্ত ধরে গেছে।
এরপর লেখাপড়া শেষ করে একটা জবে ঢুকলাম।আহা একটু শান্তিতে কয়টা দিন থাকবো তা না। বাবা মায়ের আবার এই শান্তিটা সহ্য হইতেছে না। এইটুকু একটা বাচ্চা যে নিজেই নিজের ভাড় ভালোভাবে বইতে পারেনা তার উপর আরেকটা মানুষের বোঝা চাপাইয়া দিতে চাইতেছে।
মানে বিয়া করাইয়া দিতে চাইতেছে।
শুইনাই মাথা ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘোরা শুরু করছে।
কি সর্বনেশে কান্ড।আমি এত্ত কষ্ট করে চাকরি করি।টাকা উপার্জন করি।তার টাকায় কিনা অন্যের মাইয়া পায়ের উপর পা তুইলা খাইবো।যারে কিনা আমি চিনিও না।
এইটা কি মানা যায়??
কিন্তু আমার মানা না মানায় কার কি আসে যায়।
দুইদিন পর শুনি আমার জন্য নাকি মেয়ে দেখা হয়ে গেছে।শোনার পর টেনশনে কমপক্ষে বিশবার টয়লেটে দৌড়াইছি।
অবশেষে মুখ ভার করে বসে আছি।
আমার ছোট ভাই পুরা মাস্তি মুডে আইসা বলে,
--কিরে ভাইয়া।কি শুনি?? ঘরে নাকি নতুন ভাবি আসতেছে!!??(ভাই)
আমি চুপচাপ চিন্তা করতেছি,
"কারো পিছে আইক্কাওয়ালা বাঁশ যায়,আর কেউ বইসা বইসা আইক্কা গোনে"
হায়রে কি যুগ।
অবশেষে ভাইরে জিজ্ঞেস করলাম...
-- হ্যারে তোর নতুন ভাবির তো মনে হয় কোনো ভাই বোন নাই।তাইনা রে??(আমি)
-- এমা নাই কি বলিস।ভাবিরা একটা ভাই আর একটা বোন আছে!!(ভাই)
শুইনা ৪৪০ ভোল্টের বড়সড় একটা শক খেয়ে ক্যাবলাকান্তের মত বসে আছি।
হায়রে চাইনা একটা,আইসা পরছে দুইটা...
অবশেষে পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে ওর দিকে তাকাইয়া দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বললাম..
-- এই মনে হয় তোকে শেষ স্বাস্থ্যবান দেখতেছি।
এরপর থেকে পুষ্টিহীনতায় ভুগবি।
আব্বারে বইলা লাভ নাই।হেতে ঘাউড়া পাবলিক।যা বলবে তাই।
অনার্স থার্ড ইয়ারে একবার বন্ধুরা মিলে বনভোজনে যাওয়ার কথা বলতেই সোজা না করে দিল।আমি একটু জোর করতেই কষে একটা থাপ্পর বসাইয়া দিল।
তার বিশ্বাস নাই।
এখনো থাপ্পর দিতে পারে।ভাবতাছি ভবিষ্যৎ এ বউয়ের সামনে থাপ্পর দিলে কি করমু?? তখন তো ঘাসের সাথে গলায় দড়ি দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
দেখতে দেখতে বিয়ার দিন চলে আসলো। সবাই মিলে আমারে নিয়া মেয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
মনে মনে ভাবতাছি এইটা বিয়া না।এইটা কুরবানি।আমার শান্তির জীবনটারে বিয়ার বাজারে কুরবানি দিয়া দিল।
নে শাওন জীবনে শেষ বারের মত শান্তির অক্সিজেন গ্রহন করে নে।এরপর আর শান্তি না প্যারাময় অক্সিজেন পাবি।
বিয়ে বাড়ি গিয়ে গাড়ি থেকে নামতেই গেটে দাড়িয়ে থাকা কয়েকটা সুইট এন্ড কিউট মেয়ে মাথায় গাদা ফুলের পাপড়ি ছুড়ে মারতেছে।কিন্তু মনে হচ্ছে কলেজ হোষ্টেলে রুমমেটরা যখন আলু পিয়াজ ছোড়াছুড়ির যুদ্ধ করতাম সেই যুদ্ধের আলু পিয়াজগুলো মাথায় এসে পরতেছে।
হাটতে হাটতে গেটের সামনে আসলাম।
সেই সুইট এন্ড কিউট মাইয়া গুলা গেট আটকাইয়া বলতেছে যে,"বিশ হাজার টাকা না দিলে গেট ছাড়বে না।"
কিন্তু বরপক্ষের সবাই বলতেছে দশ হাজার দিবে।কিন্তু ওরা তা মানতে চাইতেছে না।
আমিতো মহা খুশি। মানতে চাইলে গেট ছাড়বে না।গেট না ছাড়লে বিয়েও হবে না।তাইলে আমাকে প্যারার মাঝেও পরতে হবে না।
এই খুশিতে নখ টাকাইতে শুরু করলাম।শুনেছি নখ টাকাইলে নাকি ঝগড়া বাধে।
কিন্তু ফলাফল উল্টা খুব সহজেই পনের হাজারে মামলা মিটমাট হয়ে গেল।
আর আমার চেহারাটা কিসমিসের মত চুপসে গেল।
অবশেষে আমাকে একটা শরবত দিল। শরবত হাতে নিয়াই এক চুমুকে সাবার করে দিতেছি।
কারন টেনশনে অনেক তৃষ্ণা পাইছে।
শরবত প্রায়ই শেষ করে ফেলছি।তখন আব্বু কনুই দিয়ে আমাকে ঘুতা দিল।
তখন গ্লাসটা মুখ থেকে নামিয়ে আব্বুর দিকে তাকালাম। দেখি আব্বু চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে।আমার তখন আম্মুর শেখানো এতটা নীতি বাক্য মনে পরে গেল।
আম্মু বলতো যে, "গুরুজনদের আগে খেতে দিতে হয়"
এজন্য আব্বুর কাছে ভদ্রতা দেখানোর জন্য আব্বুর দিকে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বললাম..
-- আব্বু খাবেন??!!
আব্বু একটু লজ্জা পেয়ে দ্বিগুন রাগে আমার দিকে তাকালো।
তখন মনে মনে বলতেছি।হায় হায় কি করলাম।টেনশনে কিসব উল্টাপাল্টা বলতেছি।
তারপর গিয়ে বরের জন্য বরাদ্দকৃত আসনে বসলাম।
বিয়ে সম্পন হচ্ছে তখন মনকে বললাম আর কয়েকটা সেকেন্ড।তারপর তুই প্যারাময় জিবনে পদার্পন করবি।
কাজি সাহেব কবুল বলতে বললে, আমি শেষ একবার মুক্ত বাতাস টেনে নিয়ে কবুল বলে ব্যাচেলর লাইফ নামক সুখের জিবনকে টাটা বাই বাই বলে দিলাম।
এরপর খাওয়া দাওয়া শেষে বউ নিয়া আমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।পাশে বউয়ের দিকে তাকাইলাম। বুঝলাম আচ্ছামত ময়দা মাখতে।যেটুকু মাখতে তাতে দুদিন রুটি বানাইয়া খাওয়া যাবে।
পাশ থেকে ছোট ভাই খোচা দিয়া বলে..
-- কিরে ভাইয়া।ভাবির দিকে তো একনজরে তাকাইয়া আছোস!!
এখন এত দেখিস না।ঘরে গিয়া মন ভইরা দেখিস ।
একটু লজ্জা পেলাম।কালকের পোলা এত্ত পাকনামি করে।
হতভাগায় তো আর বুঝে না যে আমি ময়দা নিয়া গবেষনা করতেছি।
এরকম ধীরে ধীরে বাড়ি পৌছালাম।
আব্বু আম্মু দেখি আমারে রাইখা আমার বউরে নিয়া পরছে।
কিমুনডা লাগে।
পোলাডা এত্তদূর দিয়া আসছে একটু আদর যত্ন করবে। তা না তারে রাইখা বউরে নিয়া বইসা আছে।
মানা যায়??
অথচ এর আগে আমি বাড়ি আসলে আমাকে নিয়াই ব্যস্ত হয়ে পরতো।
হুহ....
কি আর করা।আমার একুল ওকুল সব হারাইছি।কি আর বলবো দুঃখের কথা।
সব শেষে আমাকে অনেকটা জোড় করেই বাসর ঘরে ঢুকাই দিল।
আর বললো বিলাই মারতে।
আমি রুমে ঢুকে দরজার আড়ালে থাকা লাঠি নিয়া ঘরের কোনা, খাটের কোনা,খাটের নিচ সব জায়গায় বিলাই খুজতাছি।
কিন্তু একি বিলাই কই??
বিলাই কি পলাইলো নাকি?? তাইলে আমি মারমু কি??
আমার কান্ড দেখে বউ জিজ্ঞেস করলো...
-- কি ব্যাপার কি খুজো??(বউ)
-- বিলাই খুজি(আমি)
-- বিলাই??!!!!!
-- হ্যা!!
-- কেন??
-- কারন সবাই বলছে বাসর ঘরে ঢুকে আগে বিলাই মারতে।এজন্য আমি বিলাই খুজতেছি।
তখন বউটা একটু লজ্জা পেয়ে লাজুক হাসি হেসে বললো...
-- ওনারা আসলে আমার কথা বলেছে..!!(বউ)
-- মানে?!!!?(আমি)
-- মানে আমিই বাসর রাতের বিড়াল!!
আমিতো বিশাল বড় একটা টাসকি খাইয়া হাবলার মত তাকাইয়া তাকাইয়া চিন্তা করতাছি..
-- এই ছিল আব্বার মনে?? আমারে কিনা বিলাইর সাথে বিয়া দিল। এ কেমনতরো বিচার??(মনে মনে)
-- কি হলো দাড়িয়ে আছো কেন!!??খাটে উঠে বসো!!(বউ)
আমি ধীরে ধীরে খাটে বসে বউয়ের হাতের দিকে তাকালাম।তাকিয়ে দেখি বিশাল বিশাল খাটাশের মত নখ।
আমি মনে মনে ভাবতাছি এরে বাসর রাতের বিলাই না বলে বাসর রাতের খাটাশ বলা উচিত।
যাই হোক তারপর থেকে শুরু হলো আমার প্যারাময় জীবনের অধ্যায়।
আগে কি সুন্দর যেখানে যাইতাম একা একা যাইতাম।আর এখন যেখানেই যাই সঙ্গে করে বউটারে ব্যাগের মত করে নিয়ে যাওয়া লাগে।
যা খাইতাম রিলাক্সে খাইতাম আর এখন ডাবল অর্ডার করা লাগে।এটা কি আমার মত হোষ্টেলের মেসে থাকা প্রাক্তন ব্যাচেলরের মানা উচিত??
শুধু তাই না।এখন কোলবালিশ টারেও কোলে নিতে পারিনা।
কোলবালিশ কোলে নিলেই সোজা কলার ধরে টেনে মুখের কাছে নিয়ে এসে বলে,।
-- সেই যদি কোলবালিশ নিয়াই থাকবা তো আমারে বিয়া করছো ক্যান??হুমমম??
আমি আছি কি চেহারা দেখাইতে??
কোলবালিশ ফালাও।
কিহলো কথা কানে যায় না!!??ফালাও বলছি।(বউ)
আমি কোলবালিশ না ফেললেও শোভা মানে আমার বউ কোলবালিশটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমাকে জড়িয়ে তারপর আমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে পরে।
আমি তখন শুয়ে শুয়ে চিন্তা করি।
-- কি বিপদেই না পরলাম,বউয়ের জন্য কোলবালিশ কোলে নিতে পারিনা।
সদ্য প্রাক্তন ব্যাচেলরের জন্য এটা একটা মর্মান্তিক শাস্তি।
আমার এতদিনের অভ্যাসটা কিনা বউয়ের জন্য সেক্রিফাউস করতে হইতেছে??
বউ তো এই কয়দিন।এর আগে তো আমার সাথে কোলবালিশটাই ছিল।
মাঝেমাঝে টেনশনে পরে যাই।কোলবালিশটা কিনা ক্ষেপে গিয়ে গান ধরে....
"যখন তোমার বউ ছিলনা,তখন ছিলাম আমি।
এখন তোমার বউ হয়েছে..
পর হয়েছি আমি"
নাহ কোলবালিশের সাথে এটা অন্যায় করা হচ্ছে।কিন্তু বউয়ের প্যারার কাছে আমি নিরুপায়।
তাছাড়া খরচটাও বহুগুনে বেড়ে গেছে। আগে খাওয়া আর থাকা মিলে ৬ হাজার টাকায়ই হয়ে যেত।
আর এখন বাসা ভাড়াই যায় ১৫ হাজার বাদবাকি তো পরের হিসাব।
এখন আমার মানিব্যাগের দিকে তাকালেও কান্না পায়।।
মানিব্যাগটা এখন মাস শেষে শুকিয়ে কংকাল হয়ে যায়।
অথচ ব্যাচেলর লাইফে মাস শেষেও বেশ তরতাজা থাকতো।
সবকিছুর জন্য আব্বু আম্মু দায়ি
এখন শালা শালি বাসায় আসলে খরচের খাতা খুলে বসা লাগে।
বউটা খাওয়াইয়া দাওয়াইয়া যা খরচ করে আই ডোন্ট মাইন্ড কিন্তু বাসায় আসলেই প্রতিবার বাসা থেকে চলে যাওয়ার সময় হাতে পাঁচশত একহাজার করে টাকা ধরাইয়া দেয়।
এই টাকার লোভে শালা/শালি গুলা সপ্তাহে এক দুইবার করে বাসায় আসা যাওয়া করে।
তাছাগা কোনোকিছু দরকার পরলে এখন আর বাবা মা মানে আমার শ্বশুড়কে স্বরন করেনা।
আমাকে স্বরন করে।
যেন আমি সর্বজনীন ব্যাংক।
এখন বুঝি শালা আর শালি শব্দটা কেন গালাগালি হিসেবে ব্যবহ্ত হয়।
বউয়ের কথা আর কি বলবো। ও তো পরের মেয়ে।পরের ছেলের কষ্ট কি বুঝবে।
যত পারে টাকা উড়ায়।
কষ্ট করে টাকা কামাই আমি।খরচ করে পরের মাইয়ায়।
আহা কি দুঃখ....!!
এতএত খরচাপাতি যা আমার মত হোষ্টেলের মেসে থাকা একটা ছেলে। যে কিনা হিসাব করে চলতো।
সেই ছেলের কাছে এগুলা একএকটা বজ্রপাতেরর সমান।
এতগুলা প্যারা আর দুঃখ সহ্য করতে করতে আজ আমি হার্টের রোগী😭😭😭
বিশেষ বানী: আমি কিন্তু কিপটা না।তাছাড়া এটা সকল সদ্য প্রাক্তন ব্যাচেলরের সমস্যা।😁😁
Post a Comment