ঈশিকা জানালায় হাত দিয়ে বাস ছাড়ার অপেক্ষা করছে। সবেমাত্র ভার্সিটির এক্সাম শেষ হল। তাই সিলেট নানুর বাসায় বেড়াতে যাচ্ছে। গাড়ি ছাড়ার সময় হয়েছে। হুট করেই একটা ছেলে দৌড়ে বাসে উঠল।
অরণ্যঃ-এক্সকিউজ মি, ওটা আমার সিট
ঈশিকাঃ-তো কি হয়েছে। আপনি ওটায় বসুন। আমি জানালার পাশ ছাড়া বসতে পারি না
সুন্দরী মেয়ের উপর কড়া কথা বলতে পারল না অরণ্য। অগ্যতা মেয়েটির পাশের সিটেই বসে পড়ল। রাগ জন্মাচ্ছে মেয়েটির উপর। কানে হেডফোন গুজে গান শুনতে শুরু করল।
অরণ্য মেয়েটির দিকে লুকিয়ে তাকাচ্ছে। অদ্ভুত সুন্দর মেয়েটি। জানালায় হেলান দেয়াতে বাতাসে মেয়েটির চুল উড়ছে। অরণ্যের খুব ইচ্ছে হচ্ছে চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে। ভয়ে তা আর সম্ভব হলো না।
অরণ্য চোখ বন্ধ করে মেয়েটিকে কল্পনা করছে আর মুচকি হাসছে। হঠাৎ ঈশিকাও সোজা হয়ে বসতে বসতে চোখ আটকে গেল ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে। কি নিষ্পাপ মায়াবী লাগছে। ঈশিকা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে অরণ্যের মুচকি হাসি দেখে।
হঠাৎ অরণ্য চোখ খুলতেই ঈশিকার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। ঈশিকা বেশ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে রইল। অরণ্য নিজ থেকেই কথা বলতে চাইল ঈশিকার সাথে।
অরণ্যঃ-আমরা কি আমাদের পথটুকু কথা বলে, চেনাজানা হয়ে কাটাতে পারি?
ঈশিকাঃ-আপনার বাসা কি সিলেটে? আমিও সেখানেই যাচ্ছি
অরণ্যঃ-হুম। বাবার ব্যাবসার কাজে ঢাকায় এসেছিলাম।
ঈশিকাঃ-আপনি ঘুমের মাঝে হাসছিলেন কেন? স্বপ্ন দেখছিলেন?
অরণ্যঃ-কল্পনা করছিলাম, তবে যাকে নিয়ে করছিলাম তাকে বললে গণধোলাই খাওয়ার ভয় আছে। আপনার বাতাসে ওড়া চুলগুলোর দৃশ্যটাও কিন্তু দারুণ।
ঈশিকাঃ-সিলেটে অনেক সুন্দর জায়গা আছে না? কখনো যাওয়াই হয় নি।
অরণ্যঃ-গান শুনবেন? সব চিনিয়ে দেবো যদি সুযোগ পাই।
অরণ্য ওর কানের হেডফোনের একটা ঈশিকার কানে গুঁজে দেয়। পুরো রাস্তায় নানা গল্পের মাধ্যমে দুজন খুব কাছের কেও হয়ে যায়। ইতিমধ্যে বাস ও সিলেট এসে থামে।
বাস থেকে নেমে ঈশিকা অরণ্যের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। কেও কোন কথা বলছে না।
অরণ্যঃ-চলে যাচ্ছেন। নাম্বারটা কি পাওয়া যাবেনা, কখনো দেখা না হলে নাহয় কন্ঠস্বরটাই শুনতে বিরক্ত করতাম
ঈশিকাঃ-দেখা হওয়ার ও বুঝি ইচ্ছে নেই। আমাকে তবে সিলেট ঘুরে দেখাবে কে?
এরপর থেকেই দুজন সিলেটের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ায় একসাথে। দুজন দুজনার মায়ায় জড়িয়ে যায়। কেও কাওকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেও পারেনা এই অল্পকদিনের আবেশে।
দেখতে দেখতে ঈশিকার চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে। আর ভয় বাড়তে থাকে অরণ্যকে হারানোর ভয়। অরণ্যকে ছাড়া সত্যি সুখী কখনোই হতে পারবে না ঈশিকা। এদিকে ঈশিকার বাবা মা ও তাড়া দিচ্ছে কেন যেন।
অরণ্য এসেছে ঈশিকাকে গাড়িতে তুলে দিতে। সময় বাড়ে সেই সাথে বাড়ে দুজনের দুজনকে ছেড়ে থাকার ভয়। নিরব চোখে তাকিয়ে থাকে দুজন দুজনার দিকে। চোখে চোখে কথা বাড়ে।
বাস ছেড়ে দিয়েছে। অরণ্য ঈশিকার বাসের চলে যাওয়া দেখছে। ঈশিকা পিছু ফিরে তাকায়নি। সে নিশ্চুপে কাঁদছে। তার চোখের জ্বল সে কাওকে দেখাতে চায় না।
বেশ কিছুদিন ধরে ঈশিকার পরিবার বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছে। ঈশিকা বরাবর ই না করে দিচ্ছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেও দেখতে এলে ঈশিকা বউ সেজেই সামনে যায়। পাত্রপক্ষের পছন্দ হলেও ঈশিকার জেদের কারনে যখন না বলতে হয় প্রচন্ড অপমানিত হয় তার পরিবার। এটাও ভালো লাগে না ঈশিকার। রাতভর কেদেঁ বালিশ ভেজায়, আকুল হয়ে অপেক্ষা করে অরণ্যর। আচ্ছা অরণ্য এখন কোথায়। সে কি তবে ভুলে গেল তাকে।
হন্য হয়ে প্রতিদিন ফোন দিয়েও ফোন অফ পায় অরণ্যের। ভাগ্য বিধাতা তাকেই কেন এমন কষ্ট দিচ্ছে।
ওদিকে অরণ্য ও বাবার ব্যাবসায়ের কাজে বিদেশ চলে যাওয়ার আগে ঈশিকাকে তাড়াহুড়োতে জানাতে পারে নি। দেশে ফেরার পর কোনভাবেই খোজঁ পাই না ঈশিকার। খুঁজে বেড়াতে থাকে ঈশিকাকে।
বার বার বিয়ে ভেঙে যখন আর কোন আশাও ছিলো না আর কোন ভাবে পেরেও উঠছিলো না তখন বাধ্য হয়ে একজন ডাক্তার ছেলেকে বিয়ে করতে সম্মতি দিয়েছে।
আজ ঈশিকার এংগেজডমেন্ট করাতে ছেলে পক্ষ থেকে বেশ অনেকজন এসেছে। খুব হাসিখুশি সবাই। ছেলেটি আড়চোখে ঈশিকাকে দেখছে। ঈশিকাকে খুব ই সুন্দর লাগছে। তবে ঈশিকার চোখ ভিজে আসছে। কেন অরণ্য এমন করে দূরে ঠেলে দিলো। ঈশিকা তো অন্য কাওকে এভাবে ভালোবাসতে পারবে না।
ঈশিকাকে রিং পড়াচ্ছে ঠিক ওই মুহুর্তে অরণ্য হুড়মুড় করে ঢুকে ঈশিকার দিকে এক নয়নে তাকিয়ে থাকল। ঈশিকা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। কিছুই বলতে পারছে না সে। সবাই হতভম্ব হয়ে ভীতু চোখে দেখছে ওদের দুজনকে। ঈশিকার মা বাধা দিতে যেয়েও দিতে পারল না। ঈশিকার বাবা আটকিয়ে দিল।
অরণ্য হঠাৎ ঈশিকার সামনে হাটু গেড়ে বসে হাতের রিংটি বাড়িয়ে বলা শুরু করলঃ-অনেক দেরি হয়ে গেল ইশিকা। আমি এমনটা চাইনি। হঠাৎ
কিছু কাজে বাইরে যেয়ে মনে হল হারিয়ে ফেলছি তোমায়। আমি তোমায় হারাতে পারবো না।
ঈশিকাঃ-এতোদিন কোথায় ছিলে অরণ্য। আকুল হয়ে খুঁজেছিলাম তোমায়। পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। কিভাবে খুঁজে পেলে আমায়?
অরণ্যঃ-ভালোবাসার মানুষকে ছোট্ট এই দেশে খুঁজে পাওয়া কি এতোটাই অসম্ভব?
অরণ্য সবার কাছে অনুরোধ করে ক্ষমা চাইলো। বললো-আমার কিছুই করার ছিলো না,ঈশিকাকে আমি খুব বেশি ভালোবাসি। ওকে বিয়ে করে আপনিও সুখী হতেন না। ওর মনে শুধুই আমি। দয়াকরে ওকে আমার হতে দিন।
অরণ্য ঈশিকার বাবার দিকে ফিরে তাকিয়ে হাতজোড় করে অনুরোধ করে বলল-আমি হয়তো ভুল করেছি কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম, আমার কাছে এটাই সঠিক। আপনার সম্মান হয়তো ক্ষুণ্ণ হয়েছে কিন্তু আপনার মেয়ের চোখে জ্বল আসতে দেবো না কখনোই। আপনার পর যদি কেও আপনার মেয়েকে এতোটা ভালোবাসে সেটা শুধুই আমি। দয়া করুন।
ঈশিকার বাবা ঈশিকার হাত ধরে অরণ্যের হাতে তুলে দিয়ে বলল-আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার মেয়ের মনে অন্য কেও একজন জায়গা করে নিয়েছে। সুখী হও দুজনে।
দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে আছে। ঈশিকা কাঁদছে। ঈশিকার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে আনন্দঅশ্রু। স্বচ্ছ মেঝেতে লাইটের আলোয় সেই জ্বল চিক চিক করছে। অরণ্য ঈশিকাকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে.......
إرسال تعليق