রাজের ধারণা এই মেয়েটা কিছুই জানে না, কিছুই পারে না। এরকম একটা বোকা, ক্ষ্যাত, আনস্মার্ট আর আনরোমান্টিক মেয়ের সাথে তার বিয়ে হয়েছে ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। কেন যে বাবা-মায়ের কথাই হুট করে বিয়েতে মত দিয়েছিল, তার এখন আক্ষেপ হয়।
মেয়েটার নাম রিফা, রিফা তামান্না তমা। একাই তিন তিনটি নাম নিয়ে বসে আছে! অথচ একটুও রোমান্টিক না। রাজের ধারণা এই মেয়েটার সাথে আর কিছুদিন থাকলেই সে পাগল হয়ে যাবে।
পড়াশোনা শেষ করার পরপরই মায়ের অনুরোধে  পরিবারের পছন্দে পারিবারিকভাবে বিয়ে করে রাজ। মেয়েটা দেখতে সুন্দরই বটে। বিশেষ করে মেয়েটার লম্বা ঘন কালো চুল আর চোখদুটো সুন্দর, কিন্তু বরাবরের মত মোটা ফ্রেমের চশমায় তার চোখ ঢাকা পড়ে আছে। চশমা পড়লে অনেক মেয়েকেই ভাললাগে, রিফাকেও হইত লাগবে। কিন্তু চশমাটা পাল্টাতে হবে। এই মেয়ে যে কিছুই জানে না, সেটা ঠিক না। সে কাদতে জানে, কারণে অকারণে সময়ে অসময়ে একটু কথার কম বেশি করলেই সে কাদে। কাদলে তাকে একেবারে বিচ্ছিরি লাগে। মেয়েটা ভীষণ চাপা স্বভাবের, নিজের কষ্ট অন্য কাউকে বুঝতে দেয়না।
-
রাজ জীবনে প্রেম করেনি। তবে প্রেম-ভালবাসা নিয়ে তার স্বপ্নের শেষ ছিল না। সে স্বপ্ন দেখত একটা রাগী, বদমেজাজি, হেব্বি রোমান্টিক বউ হবে তার। যে তাকে খুব ভালবাসবে। যে মেয়েটা তার বউ হবে, সে রাজের থেকে জোর করে ভালবাসা আদায় করে নিবে! অফিস থেকে একটু ফিরতে দেরি হলেই যে ভাংচুর,তছনছ শুরু করে দিবে। তার আচরণ হবে, "ভালবাসা দিবি কি না, বল?" টাইপের। যে কথায় কথায় ভালবাসার জন্য গলায় ছুরি ঠেকাতেও দ্বিধাবোধ করবে না!
রাজ স্বপ্ন দেখত, তার বিয়ে হবে এক জ্যোৎস্না রাতে। বাসররাতের সারাটারাত বউয়ের সাথে জ্যোৎস্না বিলাস করে কাটাবে!
অবশ্য রাজের বিয়ের রাতটা জ্যোৎস্না রাতই ছিল। নতুন বউ ঘরে বসে আছে, রাজ ঘরে ঢুকল রাত ১২ টায়। প্রচলিত ধারণার মত বাসর রাতেই বিড়াল মারার নামে নারী দেহের উপর ঝাপিয়ে পড়াই সে বিশ্বাষী না। ঘরে ঢুকে প্রাথমিক আলাপ সেরে নিয়ম রক্ষার্থে রাজ বলল, "আমার মনে হয়, আপনি অনেক ক্লান্ত! ঘুমিয়ে পড়ুন।"
রিফা কথা না বাড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। রাজের রাগ হলেও সেটা প্রকাশ করল না। সে দুধের স্বাধ ঘোল দিয়ে মেটানোর চেষ্টা করল! অর্থাৎ ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে একা একাই জ্যোৎস্নাবিলাস করল। সাথে তার কল্পণার বউকে পাসে ভেবে প্রায় পুরো রাতটা কাটিয়ে দিল।
এই মেয়েটা একটুও রোমান্টিক না। রাজ জানে, স্বপ্ন আর বাস্তব কখনো এক হয়না। তারপরেও তো অনেকেই কত রোমান্টিক হয়। যা হোক, রাজের ভাগ্য হয়ত ততটা ভালো নয়।
-
রাজ তাকিয়ে আছে রিফার দিকে। কি অসাধারণ সুন্দর চেহাড়া। দেখলে প্রেম করতে ইচ্ছা করে। এই মূহুর্তে ওর চোখে সেই বিখ্যাত মোটা ফ্রেমের চশমাটা নেই। চোখের পাপড়িগুলো নরাচড়া করছে, সম্ভবত স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্ন দেখলে নাকি চোখের পাপড়ি নড়ে! রাজের ইচ্ছা করছে ওর দু-চোখের পাপড়িতে চুমু খেয়ে দিতে! কপালের মাঝেও একটা চুমু খাবে। মেয়েটা ভয় পেয়ে গিয়ে রাজের বুকে মাথা রেখে গভীর গরম নিঃশ্বাষ ফেলবে!ভাবতেই রাজের গা শিউরে ওঠে………
----আচ্ছা আপনি এভাবে কি দেখছেন?
রাজ চমকে ওঠে। কখন যে রিফা জেগে উঠে বসে গেছে, রাজ খেয়ালই করে নি।
----তোমাকে দেখছিলাম! "ঠতমত খেয়ে রাজ জবাব দেই"
----আচ্ছা আমাকে কি আপনার পছন্দ হয়না?
----কেন? এ কথা বলছ কেন?
----বলার তো অনেক কারণ আছে, এই যে আপনি আমাকে ভালবাসেন না! আমার সাথে কথা বলেন না, একই ঘরে একই বিছানায় থাকার পরেও মনে হয় দুজনের মাঝে কত লক্ষ-কোটি বছরের দুরুত্ব!
রাজ অবাক হয়ে শুনছে। এত সুন্দর করেও কেউ কথা বলতে পারে? রাজের ধারণা ছিল, রিফা কিছুই জানে না বা পারে না। কিন্তু রাজের ধারণা ভুল! তার এখন মনে হচ্ছে, সুধুমাত্র কথার দ্বারাই এই মেয়েটা অনেকের মন জয় করে ফেলতে পারবে……
রিফা বলেই চলেছে…………
----জানেন, আমি না আপনাকে খুবই ভালবাসি। মাঝেমধ্যো ইচ্ছা করে আপনার থেকে জোর করে ভালবাসা আদায় করে নেই। আপনার উপর অধিকার খাটায়, আপনার উপর রাগ দেখায়, মাঝেমধ্যো আপনাকে খুব করে বকে দেই, অফিসে যেতে মানা করি, আপনার হাত ধরে দূরে কোথাও ঘুরতে যাই, আপনার বুকে মাথা রেখে ঘুমায়। জানেন, আপনি আমাকে ভালবাসেন না বলে আমার খুব কষ্ট হয়………
রিফা বলেই চলেছে, রাজ অভিভূত হয়ে শুনছে। রাজ কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। যে ভালবাসাটা সে এতদিন উপেক্ষিত রেখেছিল, তার মনে চাইছে একেবারে সব পুষিয়ে নিতে। রাজ ইতিমধ্যো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আজকে রাতে আর ঘুমাবে না।  সারারাত গল্প-গুজব করবে। গতকাল অফিসে যাবে না, ফোন করে বেশ কিছুদিনের ছুটি নিয়ে বউকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাবে, এতদিনের ভালবাসা একেবারে পুষিয়ে নিবে…………

Post a Comment

أحدث أقدم